হ্নীলা ইউনিয়নের মিনাবাজার এলাকায় ১০০ শতক আয়তনের ঘেরে কাঁকড়া চাষ করছেন সৈয়দ আলম। গত মে মাসে এই ঘেরে তিনি ১ হাজার ৭০০টি কাঁকড়ার পোনা ছেড়েছেন। কক্সবাজার শহরের কলাতলীর কোস্ট ফাউন্ডেশনের কাঁকড়া হ্যাচারি থেকে তিনি পোনাগুলো কিনেছেন। প্রতিটি পোনার দাম পড়েছে দুই টাকা। ঘেরের এক কোনায় নেট দিয়ে ঘিরে পোনাগুলোকে দুই সপ্তাহ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এরপর ৫০-৬০ গ্রাম ওজন হয়ে গেলে পোনাগুলো ঘেরে ছাড়া হয়।

সৈয়দ আলম বলেন, আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পোনাগুলো বড় হয়ে ৩৫০-৭০০ গ্রাম ওজনের হবে। তখন প্রতি কেজি কাঁকড়া ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

এদিকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়ার গফুরুল ইসলাম ৪৩ শতকের একটি ঘেরে কাঁকড়া চাষ করছেন। হ্যাচারি থেকে কেনা ১ হাজার ৫০০ পোনা ছেড়েছেন তিনি। তাঁর আশপাশে আরও ১০ থেকে ১২ জন চাষি কাঁকড়া চাষ করছেন বলে জানালেন তিনি।

default-image

হোয়াইক্যং চিংড়ি খামার গ্রুপের সহসভাপতি হারুন অর রশিদ সিকদার বলেন, কাঁকড়ার চাহিদা বাড়ছে। দামও বেশ ভালো। অন্যদিকে চিংড়ি চাষে ঝুঁকি বাড়ছে, দামও নিম্নমুখী। একবার মড়ক লাগলে ঘেরের প্রায় চিংড়ি মারা যায়। তাই চাষিরা চিংড়ি চাষ বাদ দিয়ে কাঁকড়ার দিকে ঝুঁকছেন।

প্রতি মৌসুমে একজন চাষি কাঁকড়া বিক্রি করে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
কাঁকড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা বেছে কাঁকড়া কেনেন। কেনার আগে রশি দিয়ে কাঁকড়ার হাত-পা বেঁধে দেন চাষিরা। ওজনের ভিত্তিতে কাঁকড়া বেচাকেনা হয়। এক কেজিতে তিনটি ধরে এমন কাঁকড়ার দাম সবচেয়ে বেশি। এসব কাঁকড়া ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। অন্যান্য কাঁকড়ার কেজি ১৫০-৫০০ টাকা। সবচেয়ে বেশি কাঁকড়া পাওয়া যায় ৩৫০-৪০০ গ্রাম ওজনের। দাম পাওয়া যায় ৭০০-৮০০ টাকা। মরা কাঁকড়াগুলো স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁয় কম দামে বিক্রি হয়। এসব কাঁকড়া সাধারণত পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা হয়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, কাঁকড়ার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় টেকনাফ, চকরিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজার সদরে কাঁকড়ার চাষ বেড়েই চলেছে। গত বছর জেলায় কাঁকড়া উৎপাদন হয়েছিল ৭০৫ মেট্রিক টন। এবার ৯০০ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণ করে বিপুল পরিমাণ কাঁকড়া বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০২০ সালে টেকনাফ, চকরিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজার সদরে কাঁকড়াচাষি ছিলেন ৩ হাজার ৪৬৬ জন। ২০২১ সালে বেড়েছে ২০৭ জন। চলতি বছর সেটি বেড়ে হয়েছে ৮০৪ জন। বর্তমানে জেলায় কাঁকড়াচাষির সংখ্যা ৪ হাজার ২৭০।

default-image

কোস্ট ফাউন্ডেশনের কাঁকড়া হ্যাচারি

কক্সবাজারে কাঁকড়া পোনার একটি বড় অংশ আসে শহরের কলাতলীতে গড়ে ওঠা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনের কাঁকড়া হ্যাচারি থেকে। এ হ্যাচারির উদ্যোক্তা কাঁকড়াবিশেষজ্ঞ অংছিন। কাঁকড়া পোনা উৎপাদনে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পোনা প্রজননের জন্য হ্যাচারিতে পৃথক আটটি হাউস (পানি রাখার ঘর) রয়েছে। এর মধ্যে তিনটিতে পোনা উৎপাদন চলছে। প্রতিটিতে পোনা আছে ২০-৩০ হাজার। এ পোনা বিক্রির উপযোগী করতে সময় লাগবে আরও ৩০ দিন।

হ্যাচারির মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে ১৫টি লাল প্লাস্টিক বালতি। বালতিগুলোতে রাখা একটি করে মা কাঁকড়া। মহেশখালীর প্যারাবন থেকে মা কাঁকড়াগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। হ্যাচারি প্রকল্পের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু নাঈম বলেন, প্রতিটি মা কাঁকড়া থেকে ডিম পাওয়া যায় ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ। কিন্তু বিক্রির জন্য পোনা পাওয়া যায় মাত্র ৪০-৫০ হাজার। ৬টি ধাপ অতিক্রম করতে অধিকাংশ পোনা মারা যায়। এ জন্য কাঁকড়া পোনার উৎপাদন খরচ বেশি।

কাঁকড়া চাষের উপযুক্ত মৌসুম বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর—এই আট মাস। করোনা মহামারির শুরুতে চালু হওয়া কাঁকড়া হ্যাচারিটি দ্বিতীয় দফায় চালু হয় গত ১ জুন। ওই মাসে হ্যাচারিতে পোনা বিক্রি হয় ৩৫ হাজার। চলতি জুলাই মাসের ২৫ দিনে বিক্রি হয়েছে আরও ১৫ হাজার পোনা।

আবু নাঈম বলেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হ্যাচারিতে অন্তত চার লাখ পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। জেলার চাহিদা পূরণ করে কাঁকড়া পোনা খুলনা, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন