মাছ ধরার ট্রলারে জেলে-মাঝিসহ মোট ১৪ জন ছিলেন। ট্রলারটি সাগরে অবস্থান করেছিল এক সপ্তাহ। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। গত মঙ্গলবার ঘাটে ফিরে আসা এই ট্রলার থেকে মাছ বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭০ হাজার টাকার।
ট্রলারের মালিক বরগুনার পাথরঘাটার বাসিন্দা আবদুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ২৩ সেপ্টেম্বর কথা হয় পাথরঘাটার বিএফডিসি (বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন) মৎস্যবন্দরে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘লোকসান গুনতে গুনতে আমরা প্রায় শ্যাষ। এহন আবার সরকার তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়াইছে। মোগো মনে হয়, আর বাঁচনের কায়দা নাই।’
আবদুর রহমানের মতো আরও পাঁচজন ট্রলারমালিকের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলছেন, এখন সাগরে ইলিশ ধরার ভরা মৌসুম চলছে। তবে ইলিশ ধরা পড়ছে কম, আকাল চলছে। তার ওপর ট্রলার চলানোর জন্য ডিজেলের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে খরচ মিটিয়ে লাভের মুখ দেখা কঠিন। তাঁরা এখন ভয়াবহ চাপে আছেন।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিভাগে মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ২৭৫ জন নিবন্ধিত জেলে আছেন। আর মাছ ধরার জন্য এই বিভাগে আর্টিসানাল ট্রলার (ছোট আকারের) আছে ১১ হাজার ৪৩৬টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভাগে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে। চলতি বছর তা আরও কমবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রলারমালিক ও জেলেরা বলছেন, সাত দিনের জন্য মাঝারি আকারের একটি ট্রলারে (১৪ জন) সাগরে মাছ ধরতে যেতে আট ব্যারেল তেল দরকার। স্থানীয়ভাবে প্রতি ব্যারেলে ২০০ লিটার তেল থাকে। সে হিসাবে ব্যারেলপ্রতি চার হাজার টাকা খরচ বেড়েছে। অর্থাৎ মাঝারি আকারের ট্রলারে শুধু জ্বালানি তেলের ব্যয় বেড়েছে ৩২ হাজার টাকা। আর বড় ট্রলারে (২০ জন) সাত দিনের জন্য সাগরে যেতে ১৬ ব্যারেল তেল দরকার। সে হিসাবে শুধু তেল বাবদ ব্যয় বেড়েছে ৬৪ হাজার টাকা। তবে ডিজেলের দাম বাড়ায় অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বাস্তবে তাঁদের খরচ আরও বেশি গুনতে হচ্ছে।
প্রতিবার একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু গত সপ্তাহে মাছ বিক্রি হয়েছে তিন লাখ টাকার।
২৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে পাথরঘাটার বিএফডিসি মৎস্যবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক ট্রলার ঘাটে নোঙর করা। মাঝি-মাল্লারা অলস সময় কাটাচ্ছেন। তাঁরা জানান, এখন ট্রলারগুলো সাগরে থাকার কথা। কিন্তু তেলের দাম বাড়ায় মালিকেরা এখন ট্রলার সাগরে পাঠাবেন কি না, সেই নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন। এমনিতেই সাগরে মাছ নেই। তার ওপর তেলের দাম বাড়ায় লোকসান বাড়ছে। সেখানে কথা হয় ট্রলারমালিক আবুল ফরাজীর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর চারটি ট্রলার সাগরে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। এবার তিনি লাভের মুখ দেখেননি। প্রতিবার একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু গত সপ্তাহে মাছ বিক্রি হয়েছে তিন লাখ টাকার। এখন নিজে বাঁচবেন কীভাবে, আর জেলেদের বাঁচাবেন কীভাবে?
ইলিশের উৎপাদন হ্রাসের পেছনে নদী ও সামুদ্রিক পরিবেশের নানাবিধ সংকট স্পষ্ট। নদীর মোহনা ও প্রজননক্ষেত্রের আশপাশে পানিদূষণ, অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের অবাধ ব্যবহার, নাব্যতাসংকটে ডুবোচর সৃষ্টি, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন এবং উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাব ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এ বছর বরিশাল বিভাগে ইলিশ আগের বছরের চেয়ে কম উৎপাদন হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। এখন আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি নিষেধাজ্ঞার সময় মা ইলিশ ও জাটকা সুরক্ষার বিষয়টি।আনিসুজ্জামান, বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে, জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) এর অবদান প্রায় ১ শতাংশ। আর প্রায় সাত লাখ জেলে সরাসরি এর ওপর নির্ভরশীল। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার টন। জাটকা রক্ষার দীর্ঘ প্রচেষ্টার কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টনে। নানা কারণে সেই সাফল্য এখন উল্টো পথে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আহরণ কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নামে ৫ লাখ টনে। দুই বছরের ব্যবধানে আহরণ কমেছে ৭১ হাজার টন। গত বছরের জুলাই-আগস্টে আহরণ তার আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৯ শতাংশ কম ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, জেলেদের মাছ ধরার ব্যয় অনেক বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর বরিশাল বিভাগে ইলিশ আগের বছরের চেয়ে কম উৎপাদন হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। এখন আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি নিষেধাজ্ঞার সময় মা ইলিশ ও জাটকা সুরক্ষার বিষয়টি।’