ঢ্যাঁড়স ফুল ভেবে ভুল, পথের ধারে অচেনা এক সৌন্দর্য
মহাসড়কের পাশে ঝোপে ফুটে আছে ফুলটি। দূর থেকে দেখে মনে হয় ঢ্যাঁড়স ফুল। চোখের ঘোর কাটাতে গাড়ি থেকে নামতে হলো। কাছে গিয়েও মনে হলো, দিব্যি ঢ্যাঁড়স ফুল ফুটে আছে। একই রকম স্নিগ্ধ। কিন্তু গাছের দিকে চোখ পড়তেই ভুলটা ভাঙল। এটা ঢ্যাঁড়স নয়; ফুলটি ফুটে আছে ঝোপের লতায়। পাতাও ঢ্যাঁড়সের কাছাকাছি। কী আশ্চর্য—প্রকৃতির রূপের যেন শেষ নেই।
সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় যাওয়ার পথে মহাসড়কের পাশে ফুলটি দেখা গেল। জায়গাটির নাম কানাবুড়ির মোড়। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা গেল, জায়গাটি সাতক্ষীরা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে ৮ নম্বর ধুলিয়ার ইউনিয়নে পড়েছে। গ্রামের নাম দরবাস্তিয়া।
ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের অটোরিকশায় যাত্রী তুলছিলেন দীপক ঘোষ (৩৫)। দরবাস্তিয়া গ্রামেই তাঁর বাড়ি। ঝোপে ফুটে থাকা ফুলটির নাম জানতে চাইলে বললেন, তাঁর কোনো দিন জানতে ইচ্ছা করেনি। কারও বাড়িতে এই ফুলগাছ নেই। পথের ধারে জঙ্গলে ফুটে থাকে। এর বেশি আর কিছু জানেন না তিনি।
দীপকের কথা শুনে বিস্মিত হতে হলো। বনের ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়, কিন্তু একটা স্থানীয় নাম থাকেই। একেকটা ফুলকে একেক এলাকায় একেক নামে ডাকা হয়। দীপক ঘোষ স্থানীয় নামটিও বলতে পারলেন না। বোঝা গেল, ফুল-প্রকৃতি নিয়ে তাঁর তেমন আগ্রহ নেই।
ফুলটির নাম কালো কস্তুরি বা মসুকদানা। গাছ বর্ষজীবী, রোমশ ও ঝোপজাতীয়। পাতা ৩ থেকে ৫ লতিযুক্ত। ফুল হলুদ রঙের। বৃত্তে মেরুন রঙের গোলাকার ছাপ। বীজতৈল একসময় কস্তুরি বা মৃগনাভির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফল দেখতে ঢ্যাঁড়সের মতো।
অটোরিকশায় যাত্রী হিসেবে উঠেছিলেন গ্রামের কাকুনতি ঘোষ। তাঁর ৫০ বছরের জীবনে কখনো জানতে ইচ্ছা করেনি ফুলটির নাম কী হতে পারে। প্রতিবেদকের আগ্রহ দেখে অটোরিকশার অপর যাত্রী অন্তরা ঘোষ (২৫) পরামর্শ দিলেন, ‘ইউটিউবে গিয়ে সার্চ দেন। ফুল ও ফলের নাম—দুটিই পেয়ে যাবেন। একবার আমি ইউটিউবে সার্চ দিয়েছিলাম। কিন্তু ফুলটার নাম এখন মনে নেই।’
পথচারী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম গরুর ব্যবসা করেন। তাঁরও বাড়ি একই গ্রামে। প্রতিবছর পথের ধারে এ সময়ে এই ফুল ফুটতে দেখেন, কিন্তু নাম জানেন না। কোনো দিন কারও কাছ থেকে নাম জানার ইচ্ছাও হয়নি। দেখলে ভালো লাগে। নাম বলতে পারবেন না বলে যেন এড়িয়ে গেলেন।
ফুলের আলোচনা শুনে মোড়ের দোকানি যুগল বিশ্বাস বললেন, ‘দরকার পড়ে না। নামও জানি না।’ তাঁর কথা শুনে মনে হলো, বেশির ভাগ মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া অন্য কিছুর ধার ধারে না। শুধু সৌন্দর্যের কথা কম মানুষই ভাবে। দোকানি একটা ফুল ছিঁড়ে নিয়ে দৌড় দিয়ে পাশের বাড়িতে গেলেন। খোঁপা নামের একটা মেয়েকে দেখিয়ে এনে বললেন, ‘এই ফুলের নাম নাকি কানফুল।’
ফুল হাতে দেখে রাজু (৫০) নামের এক নারী ছুটে এসে বললেন, ‘এই ফুল যেখানে লাগবে, সেখানেই চুলকাবে।’ আমাদের সহযাত্রী সাহাবুদ্দিন বললেন, ‘আমি তো একটা তুলে পাঞ্জাবির পকেটে ভরেছি।’ এ কথা শুনে ওই নারী বললেন, ‘তা ভালোই করেচো, পরে বুঝবানে।’ কিন্তু তাঁর কথা পুরোপুরি বিশ্বাস হলো না। এ প্রতিবেদকও ফুলটি ধরেছেন। কিন্তু কোনো চুলকানির অনুভূতি হয়নি।
নিশ্চিত হতে ফুলটির ছবি তুলে প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেনের কাছে পাঠানো হলো। তিনি বললেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, এটা কালো কস্তুরি বা মসুকদানা। গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গাছ।’
মোকারম হোসেনের লেখা ‘বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম’ বইয়ে দেখা গেল, তিনি এই ফুলের নাম লিখেছেন কালো কস্তুরি বা মসুকদানা। গাছের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘গাছ বর্ষজীবী, রোমশ ও ঝোপজাতীয়। পাতা ৩ থেকে ৫ লতিযুক্ত। ফুল হলুদ রঙের। মুক্ত, গভীর শিরাযুক্ত ও অসমান পাপড়ির সংখ্যা পাঁচ। বৃত্তে মেরুন রঙের গোলাকার ছাপ। বীজতৈল একসময় কস্তুরি বা মৃগনাভির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফল দেখতে ঢ্যাঁড়সের মতো, পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। বীজ থেকে চারা হয়। ভারত, থাইল্যান্ড, চীন, মাদাগাস্কার এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া যায়। বিপন্ন নয়।’
যাওয়ার পথে শ্যামনগর উপজেলায় ঢুকতে আরও দু-এক জায়গায় এই ফুলের দেখা গেল। মুগ্ধতায় মন ছুঁয়ে গেল। মনে পড়ে গেল, শিল্পী মাহমুদুন্নবীর গাওয়া জনপ্রিয় একটি বাংলা গান, ‘পথের ধারে নামহারা ফুল ফোটে কত রাত্রি দিনে, যে তারে চিনতে পারে, দাম দিয়ে তারে কেনে...’।