পরে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন পরিবারের পক্ষে কথাসাহিত্যিকের নাতি অনির্বাণ হাসান, দর্শন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মহেন্দ্রনাথ অধিকারী, ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নূরুল হোসেন চৌধুরী, বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জুলফিকার মতিন, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এস এম আবু বকর, ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মলয় ভৌমিক প্রমুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক প্রদীপ কুমার পাণ্ডে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

এর আগে সকাল সাড়ে নয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে কথাসাহিত্যিকের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টায় সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।

অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা বলেন, ‘হাসান আজিজুল হক শুধু এপার বাংলা ও ওপার বাংলার নয়, তিনি গোটা পৃথিবীর কাছে নিজেকে গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য করে তুলেছেন। তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে সমৃদ্ধির জায়গায় সংরক্ষণেরও যোগ্য। চেতনার শুরু থেকে আমরা জেনে এসেছি, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” সেই নির্যাস হাসান আজিজুল হক সবার সামনে তুলে ধরেছেন। আমার রাষ্ট্র, আমার গৌরব—এ জায়গাতে না থেকে তিনি আমি মানুষ, আরেকজন মানুষ এবং তাঁর বেদনা, আমার বেদনা—এ দুটোকে এক জায়গায় নিয়ে আসা এবং সেখানে চোখ রেখে গোটা মানুষকে দেখার কাজটি করেছেন।’

সনৎকুমার সাহা আরও বলেন, হাসান আজিজুল হককে হারানো বেদনার। এটা উপশম হয় না। তিনি ভারত থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এ বাংলায় এসেছেন। এতে তিনি যে মানবিক যন্ত্রণা পেয়েছেন, তা সাহিত্যকর্মে বারবার ফিরে এসেছে। কিন্তু ফিরে এসেছে এভাবে নয়, তিনি একজন পূর্ণ মানুষ, পূর্ণ মানবিক বাস্তবতায় নিজেকে এবং তাঁর সব পরিস্থিতিতে মানুষের মানবিক সত্তা দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।

অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, তাঁর সৃজনকর্ম এবং ব্যক্তিজীবন একই সরলরেখায় এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি কেবল লিখে দায়িত্ব পালন করেননি, যা লিখতেন, মাঠে নেমে মেরুদণ্ড সোজা করে সে কাজটি নিজেও করতেন। সেটা অবশ্যই পরিবারের জন্য নয়। তিনি দেশ, সমাজ ও বিশ্বের সব মানুষের জন্য কাজ করেছেন।

উপাচার্য গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, হাসান আজিজুল হক বিশাল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন, তা একটি অনুষ্ঠানে বলে শেষ করা যাবে না। বাংলা কথাসাহিত্যের বরপুত্র যখনই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন, তখন সেটার বিরুদ্ধে লিখেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যে কয়েকজন বাংলা সাহিত্যে ক্ষুরধার লেখনী চর্চা করেছেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর অসাধারণ ভাষাশৈলী, বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য করে তুলে ধরা, জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তু নির্বাচন—এসবই তাঁর কর্মকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তাঁর মৃত্যু সাহিত্যাঙ্গনে অসীম শূন্যতা তৈরি করেছে।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর রাতে রাজশাহী শহরে নিজ বাসভবন উজানে তাঁর মৃত্যু হয়। হাসান আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি করে গেছেন। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।