‘যদি অন্য দলকে ভোট দেন, আমি কিন্তু আপনাদের কাউকে ছাড়ব না’

মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীফাইল ছবি

‘যদি ক্ষমতায় বিএনপি থাকে, আর যদি আপনারা অন্য দলকে ভোট দেন, আমি কিন্তু আপনাদের কাউকে ছাড়ব না। প্রয়োজনে ঘরবাড়ি পোড়াইয়া সব ছারখার করে দেব।’ কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে ঋণখেলাপির অভিযোগে প্রার্থিতা হারানো বিএনপির মনোনীত মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

আসনটিতে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিনকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি। জসিম উদ্দিনের ট্রাক প্রতীকের সমর্থনে আয়োজিত একটি উঠান বৈঠকে এমন মন্তব্য করেছেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। এরই মধ্যে এমন বক্তব্য নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও সমালোচনা।

প্রথম আলোর কাছে ভিডিওর বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। তবে এটিকে ‘কথার কথা’ বলছেন তিনি। প্রচারণার শেষ দিনে মধ্যরাতে নিজের এমন বক্তব্যের কারণ হিসেবে ‘ক্লান্তি ও অবসাদ’ এর কথাও বলেছেন তিনি।

এ বিষয়ে আজ মঙ্গলবার বিকেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে প্রার্থিতা হারানো মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি ছিল মূলত কথার কথা। আসলে যখন ওই উঠান বৈঠক হয়, তখন প্রায় রাত দুইটা বাজে। আমি খুবই টায়ার্ড ছিলাম। কারণ, সকাল ৯টায় বের হয়েছি। সারা দিন ট্রাক প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী সভা ও উঠান বৈঠক করেছি। আমি অনেক ক্লান্ত ছিলাম। এমন সময়ে কথার কথা বলতে গিয়ে আমার নেতা-কর্মীদের কথাটি বলেছি। এটা কথার কথা। এর বাইরে কিছু নয়। কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রচারণার শেষ দিন গতকাল সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে দেবীদ্বার উপজেলার গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাকসার গ্রামে একটি উঠান বৈঠকে এই কথা বলেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। আসনটিতে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে ভিডিওটি প্রচার করেছেন। ৪ ফেব্রুয়ারি গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিনকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি। এর পর থেকে তাঁকে নিয়ে মাঠে আছেন প্রার্থিতা হারানো মঞ্জুরুল মুন্সী।

আরও পড়ুন

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৫৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী একটি উঠান বৈঠকে হ্যান্ডমাইকে কথা বলছেন। সেখানে বলছেন, ‘যদি ক্ষমতায় বিএনপি থাকে, আর যদি আপনারা অন্য দলকে ভোট দেন, আমি কিন্তু আপনাদের কাউকে ছাড়ব না। প্রয়োজনে তাদের ঘরবাড়ি পোড়াইয়া সব ছারখার করে দেব। আমি কিন্তু কথাটা খুব পরিষ্কারভাবে বলতাছি। এটা মনে কইরেন না আমি ভয় দেখাচ্ছি। আমি পরিষ্কার করে বলতেছি—এটা পারলে রেকর্ড করে ফেসবুকে ছাইড়া দিতে পারেন, আমার কোনো অসুবিধা নেই। সুতরাং আমাকে যেন অপমানিত না হতে হয়, আমি যদি অপমানিত হই, সেই অপমানের শোধ আমি ওইভাবে নেব কিন্তু। ঠিক আছে না? আপনারা কি আমাকে অপমানিত হইতে দেবেন? তাইলে সবাই কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারিতে ট্রাক মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে অপমানের হাত থেকে রক্ষা করবেন। তারেক রহমানকে সরকার গঠনে সহায়তা করবেন। গুনাইঘরবাসীকে সহায়তা করবেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিএনপি নেতা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী প্রথম আলোকে আরও বলেছেন, ‘দেবীদ্বারের মানুষ আমাকে ভালোবাসে। এখন পর্যন্ত আমাকে চারবার এমপি বানিয়েছে তারা। এবারও জনগণ আমাকে চেয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাকে নির্বাচন থেকে ষড়যন্ত্র করে দূরে রাখা হয়েছে। আমি ট্রাক প্রতীকের পক্ষে মাঠে নামায় দেবীদ্বারে ভোটের পরিবেশে পাল্টে গেছে। দেবীদ্বারে মানুষ ট্রাক মার্কাকে ধানের শীষ মনে করছে। চারদিকে এখন ট্রাকের গণজোয়ার। মানুষ আমার জন্য যেভাবে কাজ করত, একইভাবে ট্রাকের জন্য কাজ করছে। ইনশা আল্লাহ এই আসনে ট্রাক বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।’

বক্তব্যের বিষয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ এফ এম তারেক মুন্সী প্রথম আলোকে বলেন, ‘উনার এমন মন্তব্যে আমরাও বিব্রত। তবে এই বক্তব্য বা মন্তব্য একান্তই মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর ব্যক্তিগত। এটির দায়ভার দল বহন করবে না। তাঁর এই মন্তব্য দলীয় কোনো বক্তব্য নয়।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়ন বৈধ হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ‘বিএনপির প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন’-নির্বাচন কমিশনে এমন অভিযোগে আপিল করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এতে শুনানিতে প্রার্থিতা হারান মুন্সী। এরপর হাইকোর্ট রিট এবং সর্বশেষ প্রার্থিতা ফিরে পেতে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করলেও সেটিও ১ ফেব্রুয়ারি খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। এতে আর নির্বাচন করতে পারছেন না মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। এ কারণে বিএনপির বিজয়ের সম্ভাবনাময় আসনটি হাতছাড়া হয়ে পড়ে। ভোটের মাঠে অনেকটাই ‘নির্ভার’ হন হাসনাত আবদুল্লাহ। কারণ, তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো ‘হেভিওয়েট’ কোনো প্রার্থী ছিল না বিএনপির প্রার্থী ছাড়া। এমন পরিস্থিতিতে জোটের কারণে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিনকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি।