‘দুধ ভাঙানোর মেশিনের’ শব্দে মুখর ঘোষপাড়া, তৈরি হচ্ছে ঘি, ছানা ও টক দই
গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই যন্ত্রের শোঁ শোঁ শব্দ, কেউ হাত দিয়ে ঘুরিয়ে যন্ত্র চালাচ্ছেন, কেউবা বিদ্যুতের সাহায্যে। যন্ত্রের ওপরের পাত্রে ঢালা হচ্ছে দুধ। ভাঙানোর পর এক পাশ দিয়ে বের হচ্ছে মাখন বা ক্রিম, যা থেকে তৈরি হয় ঘি। অন্য পাশ দিয়ে বের হওয়া পাতলা দুধ থেকে তৈরি হচ্ছে ছানা ও টক দই।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুকী ইউনিয়নের উফুল্কী গ্রামের ঘোষপাড়া এলাকায় আজ শুক্রবার সকালের দৃশ্য এটি।
স্থানীয় লোকজন এই যন্ত্রকে ‘দুধ ভাঙানোর মেশিন’ নামে চেনেন। পূর্বপুরুষের আমল থেকে এই এলাকার মানুষ দুধ থেকে ঘি, ছানা ও টক দই তৈরি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন। অনেকে ছেড়েছেন পৈতৃক পেশা। তবে এখনো হিন্দু–মুসলমান মিলিয়ে শতাধিক পরিবারের নারী–পুরুষ এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এই কাজ। গড়ে ৭০ থেকে ৮০ মণ দুধ প্রক্রিয়াজাত করে ঘি, ছানা ও টক দই তৈরি করা হয়। এসব পণ্য মির্জাপুর বাজার, টাঙ্গাইল, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, চকবাজার, কচুক্ষেত ও নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করা হয়। কোনো কোনো দিন দুধের পরিমাণ ৫০ মণে নেমে আসে।
দীপক কুমার ঘোষ বলেন, ঘোষপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৮০ নারী–পুরুষ এখনো এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। মুসলমান আছেন প্রায় ২০ জন। হাত দিয়ে মেশিন চালালে ঘণ্টায় প্রায় আট মণ দুধ ভাঙানো যায়। বিদ্যুৎ–চালিত মেশিনে এর পরিমাণ আরও বেশি।
এক মণ দুধ থেকে গড়ে সোয়া কেজি ঘি এবং মিষ্টি তৈরির জন্য সাত থেকে আট কেজি ছানা পাওয়া যায় বলে জানান দীপক কুমার। তাঁর ভাষ্য, ছানার তুলনায় টক দই তৈরি করলে লাভ বেশি হওয়ায় তাঁরা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
দীপক কুমার ঘোষের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি ৬০ টাকা দরে এক মণ দুধ কিনতে খরচ হয় ২ হাজার ৪০০ টাকা। শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানির খরচসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯০০ টাকা। এক মণ দুধ থেকে পাওয়া ঘি ও ছানা বিক্রি করে আয় হয় ৩ হাজার ৪০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২৬০ টাকা। এতে লাভ থাকে ৩০০ টাকার কিছু বেশি। টক দই তৈরি করে বিক্রি করলে আয় হয় প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা। এতে লাভ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা।
আরেক বাসিন্দা গীতা রানী ঘোষ বলেন, ‘মালের (পণ্যের) অর্ডার বুইঝা দুধ আসে। মাল বেশি গেলে ১২–১৪ মণ, আর কম হইলে ৮–১০ মণ দুধ আসে। দুধ ভাঙানোর সময় আমি সাহায্য করি। হ্যারা (পুরুষ) ভাঙাইলে আমি দুধ মেশিনের ওপর দিয়া দিই।’
মির্জাপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজার থেকে ওই দুধ কেনেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা রতন ঘোষ। তিনি বলেন, শুক্রবার দেলদুয়ার বাজার থেকে প্রতি কেজি ৬০ টাকা দরে চার মণ দুধ কিনেছেন।
ছানার জন্য দুধ জ্বাল দেওয়ার সময় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল খালেকের সঙ্গে। কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থিকাই কাজ করি। আমারে মাইনষে ঘোষই মনে করে। মানুষ শীতে ঘি বেশি খায়। তখন একটু দাম থাকে।’
মালের (পণ্যের) অর্ডার বুইঝা দুধ আসে। মাল বেশি গেলে ১২–১৪ মণ, আর কম হইলে ৮–১০ মণ দুধ আসে। দুধ ভাঙানোর সময় আমি সাহায্য করি। হ্যারা (পুরুষ) ভাঙাইলে আমি দুধ মেশিনের ওপর দিয়া দিই।গীতা রানী ঘোষ, স্থানীয় বাসিন্দা
গ্রামের বাসিন্দা অনিল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘পৃথিবী সৃষ্টি হইছে পর থিকাই দুধ–দইয়ের ব্যবসা আছে। আমাগো পূর্বপুরুষের এই ব্যবসা যুগ যুগ ধইরা চলতাছে।’
উফুল্কী গ্রামের ঘোষপাড়ায় তৈরি ঘি, ছানা ও টক দই নিয়ে কথা হয় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য সুশীল চন্দ্র গোপের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঘোষপাড়ার শতাধিক পরিবারের সদস্য এই পেশার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া এখান থেকে টক দই পাইকারি কিনে ফেরি করে বিক্রি করেন ৮০ জনের বেশি মানুষ। সরকার সহযোগিতা করলে তাঁরা পৈতৃক এই পেশা ধরে রাখতে পারবেন।