‘ভোটে কে জিতে জিতুক, শুধু নতুন হাসপাতালডা চালু হোক’

শয্যা সংকুলান না হওয়ায় পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে রেখে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। গতকাল শনিবার বিকেলে তোলাছবি: প্রথম আলো

‘এখনকার দিনে মানুষ কথা দিলে কথা রাখতে চায় না। ভোটের আগে একরকম কথা বলে, আবার ভোটের পরে আরেক রকম হয়ে যায়। আমাদের চাওয়া খুব বেশি না। অসুস্থ হইলে যেন চিকিৎসাটা ঠিকমতো পাই, এটাই চাওয়া। ভোটে কে জিতে জিতুক, শুধু নতুন হাসপাতালডা চালু হোক।’

গতকাল শনিবার বিকেলে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে বিছানো বিছানায় বসে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব আবদুল মতিন। এ সময় তাঁর বাঁ হাতে চলছিল স্যালাইন।

আবদুল মতিন পঞ্চগড় সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের মীরগড় এলাকার বাসিন্দা। শনিবার বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের শয্যাসংকটের কারণে তাঁকে বারান্দার মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শুধু আবদুল মতিনই নন, শয্যাসংকটের কারণে হাসপাতালের ওয়ার্ড আর বারান্দার মেঝেতে রেখে নারী-শিশুসহ শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অথচ ১০০ শয্যার এই হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে নবনির্মিত নয়তলা ভবনটি পড়ে আছে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে।

আবদুল মতিনের ছেলে মো. সোহরাওয়ার্দী বলেন, ‘আজকে বাবা যদি আরেকটু বেশি অসুস্থ হতেন, তাহলে হয়তো রংপুর বা দিনাজপুরে রেফার করত। এ জন্য এখানে একটা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের খুব দরকার। যাঁরাই নির্বাচিত হোক, তাঁরা যেন এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন।’

পঞ্চগড়-১ আসনে (সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী) এবার সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে আলোচনায় আছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নওশাদ জমির, ১১–দলীয় ঐক্য জোট মনোনীত প্রার্থী এনসিপি নেতা সারজিস আলম ও বাংলাদেশ জাসদ (আম্বিয়া-নাজমুল) মনোনীত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধান।

পঞ্চগড়-১ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৮০৭ জন হলেও জেলা সদরের এই হাসপাতালটি জেলার প্রায় ১২ লাখেরও বেশি বাসিন্দার স্বাস্থ্যসেবার ভরসা।

শনিবার বিকেলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১০০ শয্যার হাসপাতালটিতে শিশুসহ রোগী ভর্তি আছেন ২৫৪ জন। ৩৭ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে পঞ্চগড়কে জেলা ঘোষণার পর পঞ্চগড় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে পঞ্চগড় সদর হাসপাতাল করা হয়। ২০০৫ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়ে আধুনিক সদর হাসপাতালে পরিণত হয়। এর পর থেকেই চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল-সংকট আজও কাটেনি। হাসপাতালটি ১০০ শয্যার হলেও প্রতিদিন অন্তত ২৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। শয্যাসংকট কমানো ও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরের জন্য ৯ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে আটতলা পর্যন্ত কাজ করে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে গণপূর্ত বিভাগ। পরে নবম তলায় আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিটের কাজ শেষ হলেও তা এখনো হস্তান্তর হয়নি।

হাসপাতালের পুরোনো ভবনে শয্যা সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। জেলার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গত ১৮ অক্টোবর হাসপাতালের নতুন ভবন চালুর বিষয়ে একটি সভা করেন পঞ্চগড়ের তৎকালীন জেলা প্রশাসক। সেখানে জেলা স্বাস্থ্যসহায়তা তহবিল গঠন করে তা পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। খোলা হয় ব্যাংক হিসাবও। এর পর থেকেই জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিত্তবান ব্যক্তিরা ওই তহবিলে প্রায় ২৩ লাখ টাকা অনুদান জমা দেন। তারপরও অর্থসংকটে চালু করা যায়নি হাসপাতালের নতুন ভবনটি।

১১ মাস বয়সী ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিককে শুক্রবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা এলাকার বাসিন্দা পরিবহনশ্রমিক আবদুর রহিম। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে সিট পাইনি, এ জন্য কালকে থেকে ছেলেকে নিয়ে বারান্দায় আছি। আমরা গরিব মানুষ, ভোটের হিসাব–নিকাশ বুঝি না। যে সরকার আসুক, আমরা যেন ঠিকমতো কাজকাম করে খেতে পারি আর চিকিৎসা ঠিকমতো পাই।’

সাহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘ভোটে যে-ই জিতুক, সে তো আর আমাদের পেট চালাবে না। আমাদের নিজের কাজ নিজে করে খেতে হবে। আমাদের দাবি একটাই, নয়া হাসপাতালডা চালু হোক। এটা চালু হলে আর মানুষকে শীতের মধ্যে বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হবে না।’