বাড়ির ছাদের পানির হাউস থেকে ঝিনুক তুলছেন আবদুর রহমান। সম্প্রতি যশোরের অভয়নগর উপজেলার একতারপুর গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

করোনাকাল। বিদ্যালয় বন্ধ। বাইরে চলাফেরাও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় সারাক্ষণ ঘরে বসে অলস সময় কাটে; কিন্তু বাসায় বসে অলস সময় কাটানোর ছেলে নন তিনি। একসময় তাঁর মাথায় এলো নতুন কিছু একটা করার। সেই ভাবনা থেকে  কীভাবে ঝিনুক থেকে মুক্তা হয় তা ইউটিউবে জেনে নন।

এরপর বাড়ির ছাদের পানির হাউসে দুটি ঝিনুক দিয়ে মুক্তা চাষ শুরু করেন। কয়েক দিন পর ঝিনুক দুটি ভেঙে দেখতে পান, ভেতরে মুক্তা তৈরি হয়েছে। সেই দুটি ঝিনুক থেকে এখন তাঁর ১০ হাজারের বেশি ঝিনুক। তিনি এখন কলেজে পড়েন। বাড়ির ছাদে মুক্তা চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। এই পরিশ্রমী তরুণ উদ্যোক্তার নাম আবদুর রহমান (২০)।

বাড়ির ছাদে মুক্তা চাষের পাশাপাশি রঙিন মাছ চাষও করেছেন আবদুর রহমান। সেই সঙ্গে মুক্তা চাষের ওপর যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করে দিচ্ছেন তিনি। তাঁর বাড়ি যশোরের অভয়নগর উপজেলার একতারপুর গ্রামে। চলতি বছর নওয়াপাড়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনি।

আবদুর রহমান লেখাপড়ার পাশাপাশি ঝিনুক চাষের মাধ্যমে মুক্তা তৈরি করছেন। ঝিনুক চাষের সঙ্গে রঙিন মাছের চাষও করছেন তিনি। যাঁরা বেকার বসে আছেন, তাঁরা আবদুর রহমানের ফার্মটি দেখতে পারেন।
রিপন কুমার ঘোষ, জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা, অভয়নগর, যশোর

যেভাবে শুরু

আবদুর রহমান জানান, ২০২০ সালে তিনি অভয়নগর উপজেলার রাজঘাট জাফরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়তেন। এ সময় করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ির বাইরে যেতে পারতেন না। বাড়িতে বসে পড়াশোনার পাশাপাশি অলস সময় কাটত। পাটকলশ্রমিক শ্রমিক বাবাকে সহযোগিতার জন্য কিছু একটা করার চিন্তা আসে তাঁর মাথায়।

এ সময় তিনি ইউটিউবে ঝিনুক থেকে মুক্তা চাষের পদ্ধতি দেখে উদ্বুদ্ধ হন। প্রথম দিকে পরীক্ষামূলক দুটি ঝিনুক দিয়ে মুক্তা চাষে সফলতা পান। এরপর শ্রমিক দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার খাল-বিল থেকে স্বাদুপানির প্রায় ৫০০ ঝিনুক সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৩০০ ঝিনুক নাইলনের সুতা দিয়ে তৈরি ব্যাগে ভরে ছাদের হাউসের পানিতে রেখে দেন। ২০০ ঝিনুক ছেড়ে দেন এক আত্মীয়ের পুকুরে।

মুক্তা চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে আবদুর রহমান বলেন, পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি ঝিনুকগুলোও বেড়ে উঠতে থাকে। মাছের জন্য দেওয়া খাবারই ঝিনুকগুলোর খাবার। ২০২২ সালে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ‘স্বাদুপানির ঝিনুকে মুক্তা চাষ’ শীর্ষক তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠে নামেন। অভিজ্ঞতা অর্জনে নওগাঁ ও কোটচাঁদপুরের কয়েকটি খামার পরিদর্শন করেন। ২০২২ সালের শেষের দিকে তিনি বাড়িতে এ আর অ্যাগ্রো ফার্ম গড়ে তোলেন।

বাড়ির ছাদে হাউস তৈরি

সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য বাড়ির ছাদে ২০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১০ ফুট প্রস্থের একটি পানির হাউস তৈরি করেছিলেন আবদুর রহমানের বাবা কবির হোসেন। সেখানে এখন মুক্তা চাষ করেন আবদুর রহমান। পাশাপাশি হাউসে ছোট কিছু রঙিন মাছ দিয়েছেন। এই হাউসে এখন অস্ত্রোপচার করা তিন হাজার ঝিনুক রয়েছে।

মুক্তা যেভাবে তৈরি হয়

ঝিনুক থেকে সংগৃহীত মুক্তা। সম্প্রতি অভয়নগর উপজেলার একতারপুর গ্রাম
প্রথম আলো

আবদুর রহমান জানান, ভালো ও সুস্থ দেড় থেকে দুই বছর বয়সী ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। ঝিনুকগুলো সাত দিন থেকে এক মাস পানিতে রাখা হয়। এরপর ঝিনুকগুলো উঠিয়ে ফাঁক করে তার মধ্যে দুটি করে নকশা করা ইমেজ (মুক্তার বীজ) ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো পানিতে ঝিনুকগুলো একদিন রাখা হয়। এরপর নাইলনের সুতা দিয়ে তৈরি ব্যাগে ১০টি করে ঝিনুক পুকুরের পানিতে এক থেকে দেড় ফুট গভীরে ভাসমান অবস্থায় রাখা হয়। প্যারাসিটামল গ্রুপের অজিমেট নামের ওষুধ পরিমাণমতো পানির মধ্যে দিতে হয়।

হাউসে উন্মুক্ত অবস্থায় অস্ত্রোপচার করা ঝিনুক ছেড়ে দেওয়া হয়। এর নকশা করা ইমেজ ঘিরে আবরণ পড়তে থাকে। মাঝেমধ্যে ঝিনুক তুলে ইমেজের চারপাশে আবরণ পড়ছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। এভাবে ৭ থেকে ১১ মাস রাখার পর পানি থেকে ঝিনুক তোলা হয়। পরে ঝিনুক ভেঙে তার ভেতর থেকে  মুক্তা সংগ্রহ করা হয়।

মুক্তার বাজার

আবদুর রহমান বলেন, ‘মূলত তিনটি গ্রেডের মুক্তা পাই। এগুলো হলো এ, বি ও সি গ্রেড। নকশাভেদে পাইকারি এ গ্রেডের প্রতিটি মুক্তা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। বি ও সি গ্রেডের মুক্তা একটু কম দামে বিক্রি হয়। উৎপাদিত মুক্তা সর্বনিম্ন ১০০-১৫০ টাকা আর সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। যেসব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ডিজাইনের কাজ করে, তারা মুক্তা কিনে নেয়। এক বছরে দুই লাখ টাকার মুক্তা বিক্রি করেছি। ওসব মুক্তা তৈরি করতে সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল। পুকুর ভাড়া ১৫ হাজার টাকা ছাড়াও তৈরি করা ইমেজ ৬ টাকা, নাইলনের সুতায় তৈরি নেট ৪০ টাকা এবং সংগ্রহ করা ঝিনুক ৫ টাকা করে বিক্রি করি। এখন যে ঝিনুক আছে, তাতে ছয় লাখ টাকার মুক্তা বিক্রি করা যাবে বলে আশা করছি।’

খামারে ১৯ জনের কর্মসংস্থান

আবদুর রহমানের খামারে কাজ করছেন ১৯ জন কর্মী। এর মধ্যে ঝিনুক সংগ্রহের কাজে পাঁচজন, নিউক্লিয়াস তৈরিতে পাঁচজন, মুক্তায় ডিজাইন করার জন্য দুজন এবং নেট তৈরিতে সাতজন কর্মী কাজ করছেন। দিনে কর্মীদের ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে আবদুর রহমানের বোনের বাড়ি অভয়নগর উপজেলার নাউলী গ্রামের দুটি পুকুরে সাড়ে সাত হাজার ঝিনুক এবং ছাদের ওপরে নির্মিত হাউসে তিন হাজার ঝিনুক রয়েছে। হাউসে ঝিনুকের পাশাপাশি রঙিন মাছের চাষ করেও মাসে তিনি গড়ে তিন হাজার টাকা আয় করছেন।

আবদুর রহমান বলেন, ‘নতুন কিছু করার চেষ্টা থেকে ইউটিউব দেখে মুক্তা চাষের পাশাপাশি ও রঙিন মাছ চাষ শুরু করেছিলাম। এখন দেশের নামকরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে গোল ও ডিজাইন করা মুক্তা সরবরাহ করি। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি। সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে মুক্তা ও রঙিন মাছের খামার আরও বড় করতে পারব। ’

আবদুর রহমান বলেন, ‘ভারতের বাজারে মুক্তার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। সরকারিভাবে ভারতসহ অন্যান্য দেশে মুক্তা রপ্তানির সুযোগ হলে বিদেশে মুক্তার বাজার সম্প্রসারিত হবে। বিদেশে মুক্তা রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে।’

অভয়নগর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘আবদুর রহমান লেখাপড়ার পাশাপাশি ঝিনুক চাষ করে মুক্তা তৈরি করছেন। ঝিনুক চাষের সঙ্গে রঙিন মাছের চাষও করছেন তিনি। যাঁরা বেকার বসে আছেন, তাঁরা আবদুর রহমানের ফার্মটি দেখতে পারেন। এ নিয়ে কাজ করলে বেকার যুককেরা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দ্রুত স্বাবলম্বী হতে পারবেন। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আবদুর রহমানের মতো উদ্যোক্তা অনেকের কাছে অনুকরণীয়।’