লুসাই কারা, সাজেকের লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কে কী আছে
রাঙামাটির সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে লুসাই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, পোশাক, জীবনযাপন ও বীরত্বগাথা তুলে ধরে গড়ে উঠেছে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক। লুসাইদের প্রাচীন গ্রাম, তাঁতে বোনা পোশাক, মাচাংঘর, ‘জলবুক’ যুদ্ধঘরসহ নানা উপকরণ দেখার সুযোগ পাচ্ছেন পর্যটকেরা। পর্যটনকে সমৃদ্ধ করা ও হারিয়ে যাওয়া লুসাই সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করাই পার্কটির মূল লক্ষ্য।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রে ঢুকতেই ছোট একচিলতে জায়গায় গড়ে উঠেছে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক। সেখানে ৩০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকলে দর্শনার্থীরা যেন একটা আদি অকৃত্রিম লুসাই গ্রাম খুঁজে পান। লুসাই জনজাতি কেমন ছিল এক সময়, তাদের সংস্কৃতি, পোশাকপরিচ্ছদ, থাকার ঘর, ব্যবহৃত হাতিয়ার, বাদ্যযন্ত্র—সবই দেখার সুযোগ মিলবে পর্যটকদের। কেবল তা–ই নয়, লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে তোলা যাবে ছবিও।
সম্প্রতি সাজেকে গিয়ে ‘লুসাই ভাংখুয়া পার্ক’, অর্থাৎ লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কে পর্যটকদের বেশ ভিড় লক্ষ করা গেল। ‘মেঘের ওপরের দেশ’ সাজেক একসময় লুসাই–অধ্যুষিত ছিল। এখন বহু পরিবার ভারতের মিজোরামে অভিবাসন করেছে। আগের তুলনায় কমে গেলেও সাজেকের ছোট-বড় সব পাড়ায় লুসাইদের সাংস্কৃতিক প্রভাব এখনো অটুট। রুইলুই মৌজার হেডম্যানও একজন লুসাই। নাম লালথাঙ্গা লুসাই। মূলত তিনি ও তাঁর পরিবারের উদ্যোগেই এই পার্ক গড়ে উঠেছে। উদ্দেশ্য সাজেকের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরা।
সাংস্কৃতিক পার্কের ব্যবস্থাপনায় যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে লুসাইদের জীবনযাপন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেল। তার আগে জেনে নেওয়া ভালো, এ প্রসঙ্গে গবেষকেরা কী বলছেন। মিয়ানমারের রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক ভুমসন তাঁর ‘জো হিস্ট্রি’ বইয়ে লুসাইদের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, লুসাইরা ‘জো জাতির’ অন্তর্ভুক্ত ছয়টি জনজাতির একটি। জো জাতির বাকি পাঁচটি জনজাতি হলো বম, পাঙ্খোয়া, খুমি, ম্রো ও খিয়াং। মিয়ানমারের আরাকান থেকে শুরু করে ভারতের মণিপুর ও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশজুড়ে লুসাইদের বসবাস। ভারতের মিজোরামে লুসাইরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
প্রাচীন যোদ্ধা জাতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীন যোদ্ধা জাতি হিসেবে লুসাইদের পরিচিতি রয়েছে। স্বাধীনচেতা এই জাতি কখনো কারও বশে আসেনি। এ কারণে ১৮৭১ সালে আসাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে জেনারেল ব্রাউনলো ও বোর্চিয়ারের নেতৃত্বে লুসাই দমন অভিযান পরিচালিত হয়। দীর্ঘ অভিযানের পর লুসাইরা সন্ধি করতে বাধ্য হয়। তবে এরপরও পুরোপুরি বাগে আনা যায়নি তাদের। লুসাইদের মধ্যে বীরের কদর আছে। গ্রামের বীরযোদ্ধাকে সবাই সম্মান করে। বলা হয়ে থাকে, লুসাই বীরেরা কখনো পেছনে ফিরে তাকান না। যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী লুসাই গ্রামগুলোয় শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য থাকত উঁচু টংঘর। এ ছাড়া ‘জলবুক’ নামের বিশেষ একটি ঘরে থাকতেন লুসাই পুরুষেরা। এই ঘরে অস্ত্র সঙ্গে রাখা ছিল বাধ্যতামূলক। যেকোনো সময়ে যাতে পুরুষেরা লড়াইয়ে যোগ দিতে পারেন, সে জন্য এমন ব্যবস্থা। সাজেকের লুসাই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে গিয়ে ‘জলবুক’ ঘরের দেখা পাবেন পর্যটকেরা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীন যোদ্ধা জাতি হিসেবে লুসাইদের পরিচিতি রয়েছে। স্বাধীনচেতা এই জাতি কখনো কারও বশে আসেনি। এ কারণে ১৮৭১ সালে আসাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে জেনারেল ব্রাউনলো এবং বোর্চিয়ারের নেতৃত্বে লুসাই দমন অভিযান পরিচালিত হয়। দীর্ঘ অভিযানের পর লুসাইরা সন্ধি করতে বাধ্য হয়।
কী আছে পার্কে
লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কে তাঁতে বোনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। জানা গেল, লুসাই নারীরা কোমরতাঁতে ‘পুয়ানফেল’ (থামি), ‘করচুং’ (ব্লাউজ), ‘করচুর’ (পুরুষের শার্ট) ও পুয়ানবি (লুঙ্গি) বোনেন। পরেন নানা নকশার পাথরের ও ধাতুর ভারী গয়না। সাদা, কালো ও লাল রঙের নকশায় সাজানো পোশাক দৃষ্টিনন্দন। ১০০ টাকার বিনিময়ে পার্কে এসব পোশাক পরে ছবি তুলতে পারেন পর্যটকেরা। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী লুসাই মাচাংঘর দেখারও সুযোগ মিলবে সেখানে। লুসাই মাচাংঘরে ঢুকতেই অভ্যর্থনাকক্ষ। লম্বাটে সেই ঘরে লুসাইরা শিকার করা বিভিন্ন প্রাণীর মাথার ট্রফি ঝুলিয়ে রাখে। এ ছাড়া পার্কে ঢুকে দোকানি ছাড়া দোকানের দেখাও মিলবে। সেখান থেকে পর্যটকেরা চাইলে লুসাইদের বিভিন্ন স্মারকও কিনতে পারবেন।
পার্কে রাখা সাংস্কৃতিক উপকরণে বর্ণাঢ্য লুসাইজীবন যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। লুসাই যোদ্ধাদের ম্যুরাল, বীরদের বীরত্বের কাহিনিও লিপিবদ্ধ আছে সেখানে। খুব সুপরিসরে না হলেও পার্কজুড়ে হরেক রঙের বাহারি ফুল, গাছগাছালিতে ভরা। সব মিলিয়ে যেন এক অন্য জগৎ।
মুগ্ধ পর্যটকেরা
সম্প্রতি সাংস্কৃতিক পার্কে দেখা হয় চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থেকে আসা নবদম্পতি জয় ধর ও অনন্যা বণিকের সঙ্গে। দুজনে লুসাই পোশাকে পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। অনন্যা বণিক বলেন, সাজেক ও লুসাই পার্ক অসাধারণ, অনুভূতি প্রকাশ করার ভাষা নেই। এখানে আসা সার্থক হয়েছে। প্রথমবার সাজেকে এসেছেন ঢাকার মিরপুরের রাকিব হোসেন ও তমা। তাঁরা জানান, সাজেকে এসে প্রকৃতির প্রেমে পড়েছেন। পাশাপাশি লুসাই পার্কে এসে নিজেদের লুসাই মনে হচ্ছে।
ভারতের মিজোরাম সীমান্তের পাশে ১ হাজার ৮০০ ফুট উঁচু রুইলুই পাহাড়। পাহাড়চূড়ায় লুসাইদের প্রাচীন বাসস্থান রুইলুইপাড়া ও কংলাকপাড়া। সেখানেই গড়ে উঠেছে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র। আর এই নিসর্গের মধ্যে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কটি সাজেক পর্যটনকেন্দ্রকে আরও বেশি মুগ্ধতায় ভরিয়ে তুলেছে।
লুসাই সাংস্কৃতিক পার্কে তাঁতে বোনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। ১০০ টাকার বিনিময়ে পার্কে এসব পোশাক পরে ছবি তুলতে পারেন পর্যটকেরা। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী লুসাই মাচাংঘর দেখারও সুযোগ মিলবে সেখানে।
পার্কের ব্যবস্থাপক কালাচাঁন ত্রিপুরা জানান, ছুটির দিন ছাড়া টিকিট বিক্রি ও পোশাক ভাড়া থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়। ছুটির দিনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকাও হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অগ্নিকাণ্ডে পর্যটন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্রদের একটা অংশ দেওয়া হয় এই আয় থেকে।
লুসাই পার্কের প্রতিষ্ঠাতা রুইলুই মৌজার হেডম্যান লালথাঙ্গা লুসাই ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কথা হয় পরিবারের সদস্য ও পরিচালকদের একজন নুপুই লুসাইয়ের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে লুসাই জনগোষ্ঠী এখন খুবই কম। ঐতিহ্য-সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। পর্যটনকে সমৃদ্ধ করা, বিলুপ্তপ্রায় লুসাই সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত ও পর্যটকদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পার্কটি করা হয়েছে। এটি পারিবারিক আয়ের উৎস এবং পর্যটকদের বিনোদনের ক্ষেত্রও।