দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভ্যন্তরেও দুর্নীতি আছে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। তিনি বলেছেন, দুদক কর্মকর্তারা কী করছেন, সেদিকেও সবাইকে নজর রাখতে হবে, যাতে কেউ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে না পড়েন। কাজ হোক বা না হোক, কেউ ঘুষ দেবেন না। সরকারি চাকরি যাঁরা করেন, সেবাপ্রত্যাশীদের কাজ তাঁদের করতেই হবে, কাজ না করার কোনো বিকল্প নেই।
আজ রোববার সকালে বগুড়ার শহীদ টিটু মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন দুদকের চেয়ারম্যান। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ শোনার জন্য এই গণশুনানির আয়োজন করা হয়।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আখতার হোসেন, দুদকের বগুড়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মাহফুজ ইকবাল প্রমুখ।
গণশুনানিতে আসা ব্যক্তিদের উদ্দেশে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, দুর্নীতি সমাজকে কলুষিত করে এবং দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। দেশের বৃহৎ স্বার্থে দুর্নীতি রোধ করতে হবে। তবে দুদকের একার পক্ষে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাইকে এককাট্টা হতে হবে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্নীতিকে রুখে দিতে হবে।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বগুড়ার সন্তান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খ্যাতি ছিল যে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয়ও দিতেন না। বগুড়াবাসী কখনো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবে না।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, গণশুনানির জন্য ১৫ দিন ধরে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৯৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে দুদকে শুনানিযোগ্য ছিল ৬৭টি। এর মধ্যে ৫৭ জনের করা অভিযোগের গণশুনানি করা হয়। শুনানিতে ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কথিত দুই কর্মকর্তাকে আটক করার পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে উপস্থিত না থাকায় পদ্মা ইনস্যুরেন্সের স্থানীয় কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন দুদক চেয়ারম্যান। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চার লেন প্রকল্প এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেওয়া বাঙালি নদ খনন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তা অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন দুদক চেয়ারম্যান।
শুনানিতে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, জেলা সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে দলিলের বিষয়ে কথা বললে ঘুষ দাবি করা হয়। আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, বগুড়া পৌরসভার প্ল্যান পাসের পরও বাড়ি নির্মাণে বাধা দেওয়া হয়। অন্য এক ভুক্তভোগী বলেন, বগুড়া জেলা কারাগারের ক্যানটিনে খাবারের দাম দ্বিগুণ। কারাগারে প্রবেশের সময় হাজতিদের কাছ থেকে জমা নেওয়া মালামাল ঠিকমতো ফেরত দেওয়া হয় না। পিসিরি টাকা নিয়ে তুঘলকি কারবার চলে।
অপর এক ভুক্তভোগী দুদক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করেন, বগুড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এলএ শাখার একজন কানুনগো অধিগ্রহণ করা একজনের জমির টাকা অন্যজনকে দিয়েছেন। বগুড়া পাসপোর্ট কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা এক ব্যক্তি হয়রানির কথা তুলে ধরেন দুদক চেয়ারম্যানের কাছে।
শুনানি শেষে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হয়রানি ছাড়াই সাধারণ মানুষ যাতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়, দুর্নীতি যাতে না হয়, সে উদ্দেশ্যেই দুদকের পক্ষ থেকে এই গণশুনানির আয়োজন।
এদিকে রাতে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বগুড়ায় দুদকের গণশুনানিসম্পর্কিত একটি সংবাদ কমিশনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সংবাদে পরিবেশিত তথ্য বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণশুনানি চলাকালে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। দুর্নীতি দমন কমিশন জনৈক সাকোয়াত হোসেনের ব্যক্তিগত মৎস্য খামারের মাছ লুট হওয়াসংক্রান্ত একটি অভিযোগ আমলে নেয়নি বলে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। উক্ত অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪–এর তফসিলভুক্ত অপরাধ নয়। দুদকের তফসিলবহির্ভূত অপরাধবিষয়ক কোনো অভিযোগ গণশুনানিতে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। কমিশনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের অনুরোধ করা হলো।
সংশোধনী
প্রতিবেদনটিতে প্রথমে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ‘বগুড়ায় দুদকের গণশুনানিতে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ বলতে না পারায় জুতা নিক্ষেপ’ উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হতে না পারায় রাত সাড়ে ৯টায় শিরোনামসহ প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে।