সেখানে কথা হয় লালমনিরহাটের কাকিনা থেকে ঘুরতে আসা চাকরিজীবী ইমরুল কায়েসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্ত্রীসহ দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ঈদের পর এখানে বেড়াতে এসেছি। খোলামেলা জায়গা, বিশাল নদী, সেতু এবং তিস্তায় ভাসমান রেস্তোরাঁটি দেখতে অসাধারণ লাগে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ বা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে তিস্তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখলে মনটা জুড়িয়ে যায়। সময় পেলে এখানে বেড়াতে আসি।’

রংপুর মহানগর থেকে বন্ধুকে নিয়ে বেড়াতে আসা সাবরিনা মৌ বললেন, এখানকার অনুভূতি ও ভালোলাগাটা অন্য রকম। বেড়ানোর জন্য এটি একটি নিরাপদ জায়গা। পড়ন্ত বিকেলে সেতুতে, তিস্তাপাড়ে এবং ভাসমান রেস্তোরাঁয় দাঁড়ালে বা ডিঙি করে নদীতে ঘুরে বেড়ালে বিষণ্নতা কেটে মনে সীমাহীন আনন্দ জাগে। এখানকার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর।

রংপুরের কাউনিয়া থেকে আসা চাকরিজীবী আলমগীর হোসেন (৪২) বলেন, বর্তমানে প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। এমন সময়ে সেতুর কাছে এসে নদীপাড়ের ঠান্ডা বাতাসে দেহ-মন জুড়িয়ে গেছে।

স্থানীয় কয়েক বাসিন্দা জানান, একসময় নিভৃত এবং মঙ্গাপীড়িত গ্রাম ছিল মহিপুর। লোকজন ছিল বেকার। যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক থাকায় গ্রামে বাইরের কেউ আসতেন না। সেতুকে ঘিরে দর্শনার্থীদের আনাগোনায় গ্রামটিতে ফিরেছে প্রাণ চাঞ্চল্যতা। গ্রামের অনেকে সেতুর আশপাশে ও বাঁধের ওপরে ছোটখাটো দোকান করে বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। এখানে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক ছোট–বড় বিভিন্ন দোকান। এর মধ্যে খাবারের দোকান আছে অর্ধশতাধিক।

সেতুর পূর্ব–দক্ষিণ প্রান্তে তিস্তা নদীতে মহিপুর গ্রামের ১০ বন্ধু মিলে গড়ে তুলেছেন ‘স্বপ্নতরী’ নামের একটি ভাসমান রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁটি করতে সময় লেগেছে প্রায় এক বছর। ১০০টি প্লাস্টিকের ড্রাম, কাঠ, টিন ও লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে তা তৈরিতে খরচ পড়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। রেস্তোরাঁর ভেতরে ও বাইরে একসঙ্গে ৭৫ জন বসা যায়।

উদ্যোক্তা ওই ১০ বন্ধুর একজন হলেন কায়েস হাসান চৌধুরী (৪২)। তিনি লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য। বাড়ি মহিপুর গ্রামে। তিনি বলেন, মহিপুরসহ গঙ্গাচড়া ছিল মঙ্গাকবলিত এলাকা। যোগাযোগব্যবস্থা ছিল ভঙ্গুর। সেতুর নিরাপত্তায় বাঁধ দেওয়ায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন রোধসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। এতে গ্রামের মানুষের জীবনধারা বদলে গেছে। দৃষ্টিনন্দন সেতু ও তিস্তার অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে এখানে প্রতিদিন নানা বয়সের অসংখ্য মানুষ বেড়াতে আসেন। তাঁরা সেতু ও নদীর পাশাপাশি রেস্তোরাঁটি ঘুরে দেখেন।

কায়েস হাসান চৌধুরীর দাবি, উত্তরাঞ্চলে নদীতে এটি একমাত্র ভাসমান রেস্তোরাঁ। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর চালু করা হয়। রেস্তোরাঁয় কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় আটজনের।
ওই রেস্তোরাঁয় চা, কফি, স্যুপ, চিকেন ফ্রাই, বার্গার, চিকেন রোল, কোমল পানীয়, ভাত, বিরিয়ানি, লাচ্ছিসহ বিভিন্ন খাবার পাওয়া যায়।

মহিপুর এলাকার স্কুলশিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, দৃষ্টিনন্দন শেখ হাসিনা সেতু, তিস্তা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য ও স্বপ্নতরী ভাসমান রেস্তোরাঁটি দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষের পদচারণ ঘটছে। তিস্তা নদীর প্রস্থ গড়ে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার। এর চার কিলোমিটারজুড়ে পানি। এখানে প্রচুর খাসজমি থাকায় সরকার এই স্থানকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়তে পারে।

সেতুপাড়ের চটপটি ব্যবসায়ী নুর আলম বলেন, আগে খুব অভাব ছিল। সেতু হওয়ার পর বাঁধের ওপর দোকান করে অনায়াসে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাচ্ছি। সেতুর কারণে আমার মতো গ্রামের অনেকে দোকান করে ভালোভাবে দিন যাপন করছেন।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তুহীন ওয়াদুদ বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিস্তা নদী। গঙ্গাচড়ার তিস্তা নদীর উত্তর তীরের শংকরদহ ও দক্ষিণ তীরের মহিপুরকে সংযুক্ত করেছে সেতুটি। প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে, অবকাশ বা ছুটি কাটাতে অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেখানে ছুটছেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন