‘আব্বু, আব্বু, আমাদের জাহাজে মিসাইল অ্যাটাক হইছে, দোয়া করো’

‘এমভি কেপ দাও’ নামের জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী মো. আমান উল্লাহছবি: সংগৃহীত

অসুস্থ ভাইকে নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের এনায়েতবাজারের বাসা থেকে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন মো. সাকিব আমান। গাড়িতে ছিলেন তাঁর মা ও দুই ভাই। পথে হোয়াটসঅ্যাপে বাবা মো. আমান উল্লাহর নম্বর থেকে একটি অডিও বার্তা আসে।

অডিও চালু করতেই বাবার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ, ‘আব্বু, আব্বু, আমাদের জাহাজে মিসাইল অ্যাটাক হইছে। দোয়া করো আব্বু, দোয়া করো। হয়তো আর কমিউনিকেশন করতে পারব না, আব্বু। সাবধানে থাইকো। আর দোয়া করো।  আম্মুকে (সাকিবের মা) এই কথা বলার দরকার নাই। আম্মু খুব চিন্তা করবে।’

বাবার এমন বার্তা শুনে গাড়িতে থাকা তিন ভাই থমকে যান। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে কথাটি আর গোপন রাখা গেল না। অডিওটি লাউড স্পিকারে চলায় তিনিও সব শুনে ফেলেন। ছেলের ভাষায়, খবরটি শুনেই তাঁর মা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন।

ঘটনাটি বুধবারের। মো. আমান উল্লাহ ‘এমভি কেপ দাও’ নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ারে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ভারতের দিকে যাওয়ার পথে ওমান উপকূলে হামলার শিকার হয়।

‘এমভি কেপ দাও’ নামের জাহাজে হামলা
ছবি: ভিডিও থেকে

সাকিব আমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবা বেলা ১টা ৬ মিনিটে ওই অডিও বার্তা পাঠান। এরপর বেশ কিছু সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।

প্রধান প্রকৌশলী আমান উল্লাহ মেরিন ফিশারিজ একাডেমির ১৫তম ব্যাচের সাবেক ক্যাডেট। ছেলে সাকিব আমানও বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি ৫৩তম ব্যাচের ক্যাডেট। তিনি জুনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত। এখন তিনি চট্টগ্রামে রয়েছেন।

ইঞ্জিনের কাছে হামলা

বাবার কাছ থেকে পরে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সাকিব বলেন, জাহাজটির পেছনের দিকে ইঞ্জিন ও আবাসন এলাকার কাছে পরপর দুটি আঘাত লাগে। এতে তাঁর বাবার কেবিনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে হামলার সময় তিনি কেবিনে ছিলেন না। দায়িত্ব পালন করছিলেন নিয়ন্ত্রণকক্ষে। এ কারণে প্রাণে বেঁচে যান।

ওমানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী এমভি কেপ দাও ওমানের মুসান্দাম উপকূল থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে হামলার শিকার হয়। এতে জাহাজের ইঞ্জিনকক্ষে আগুন ধরে যায়। রয়্যাল নেভি অব ওমান ২৭ নাবিককে উদ্ধার করে। একজন নাবিক নিহত হন।

হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজের একটি কক্ষ
ছবি: ভিডিও থেকে

ভারতের টাইম অব ইন্ডিয়া দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, নিহত নাবিক ভারতীয়। জাহাজে মোট ২০ ভারতীয় নাবিক ছিলেন; তাঁদের মধ্যে ১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

‘এখন বাবা নিরাপদে আছেন’

সাকিব আমান বলেন, হামলার পর তাঁর বাবাসহ জীবিত নাবিকদের জাহাজ থেকে সরিয়ে ওমানে নেওয়া হয়েছে। পরে পরিবারের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আব্বু এখন নিরাপদে আছেন। তাঁকে ওমানে রাখা হয়েছে। প্রথমে ওই অডিও শোনার পর আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। পরে যখন জানতে পারলাম তাঁকে উদ্ধার করা হয়েছে, তখন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি।’

তবে কয়েক মিনিটের সেই অনিশ্চয়তার কথা ভুলতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।