বালু তোলা বন্ধে প্রার্থীর শক্ত অবস্থান চান ভোটাররা

কর্ণফুলী নদী থেকে বালু তোলায় ভেঙে যাচ্ছে পাড়। নদীতে বিলীন হওয়া জমি দেখাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম । গত রোববার বিকেল চারটায় রাঙ্গুনিয়ার গোডাউনের ভূমির খিল এলাকায়ছবি: জুয়েল শীল

‘যে হারে নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে, আগামী বর্ষায় বাপ-দাদার বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে আশপাশের জায়গা তলিয়ে গেছে। বারবার বলা হলেও বন্ধ হচ্ছে না বালু তোলা। ভাঙনরোধে দেওয়া হয়নি কোনো বাঁধ। বসতভিটা হারাতে বসেছি। বালু তোলা বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারবে, এমন প্রার্থীকে ভোট দেব।’

কথাগুলো একনাগাড়ে বলছিলেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পশ্চিম সরফভাটা ইউনিয়নের গোডাউন ব্রিজ-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ আলম। কর্ণফুলী নদীর পাড়ে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। গত রোববার দুপুরে নদীর পাড়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।

খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের আমলেও বালু তোলা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর বিএনপির কিছু লোক বালু তুলছেন। যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, এখন নদীতে নামতেও ভয় লাগে। সব সময় শঙ্কায় থাকি—কখন ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। সপ্তাহখানেক আগে তাঁর বাড়ির পাশে থাকা একটি বড় কড়ইগাছ মাটি সরে নদীতে উপড়ে পড়ে গেছে।

শুধু খোরশেদ আলম নন, রাঙ্গুনিয়ার শিলক, কদমতলী, মরিয়মনগর, সরফভাটা ও কোদালা এলাকার কর্ণফুলী নদীর পাড়ের বাসিন্দারাও বসতভিটা হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের যানজট, সড়ক সরু হওয়ায় দুর্ঘটনা বৃদ্ধি, শিল্পায়নের অভাব, উন্নত হাসপাতাল না থাকাসহ নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তাঁরা। এসব সমস্যার সমাধানে এবার যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়ার কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

খোরশেদের ঘরের পাশেই আরও পাঁচটি পরিবার থাকে। তাঁদের একজন নজরুল ইসলাম। নদীর পাড়ে বসে মাথায় হাত রেখে তিনি বলেন, ‘বালু তোলা কি বন্ধ হবে না? কোথায় গেলে এর বিচার পাব? যে প্রার্থী আমাদের বাড়িঘর রক্ষা করবে, বালু তোলা বন্ধ করবে, তাকেই ভোট দেব।’

নজরুল ইসলামের কথা শেষ না হতেই তাঁর স্ত্রী নুর বেগম বলেন, ‘কিছুই হবে না। যারা ক্ষমতায় আসে, তারা লুটেপুটে খায়। আমাদের গরিবের কিছু হয় না। আমরা কোনো সাহায্য চাই না, চাই ন্যায্য অধিকার। শুনেছি বালু তুললে পরিবেশের ক্ষতিও হয়। কিন্তু যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে তো কিছুই হচ্ছে না।’

নজরুল ইসলামের ঘর থেকে একটু পশ্চিমে একটি ছোট মসজিদ রয়েছে। মসজিদের অজুখানা থেকে মাত্র দুই হাত দূরে ভাঙন শুরু হয়েছে। মসজিদের দায়িত্বে থাকা মাওলানা আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দিনদুপুরে বালু তোলা হচ্ছে। বাড়িঘর, মসজিদ ভাঙনের পথে। কিন্তু কারও কোনো পদক্ষেপ নেই।’

গোডাউন ব্রিজের পূর্ব পাশে নদীর পাড়ে ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে দেখা যায় এক যুবককে। একসময় সেখানে তাঁর ঘর ও জমি ছিল। নদীভাঙনে সব বিলীন হয়ে গেছে। শহীদুল্লাহ নামের ওই ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের ৬০ শতক জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। বালু উত্তোলনের কারণেই ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনরোধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই।

মরিয়মনগরের রফিক উদ্দিনও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, অতিরিক্ত বালু তোলার কারণে গত বর্ষায় তাঁদের ভিটেবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এখন তাঁরা আত্মীয়ের বাসায় থাকছেন। ভোটের বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা সবাই প্রথমে তাঁদের সমস্যার কথা বলেন। পরে বলেন, যে প্রার্থী তাঁদের ভিটেবাড়ি রক্ষা ও বালু তোলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন, তাঁকেই তাঁরা ভোট দেবেন।

নির্বাচনী সমাবেশ বক্তব্য দেন বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী। গতকাল বিকেলে রাঙ্গুনিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে
ছবি: সংগৃহীত

রাঙ্গুনিয়াবাসীর দুঃখ কাপ্তাই সড়ক

চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কই রাঙ্গুনিয়াবাসীর শহরে যাতায়াতের একমাত্র সড়ক। যানজট এখানে নিত্যদিনের সঙ্গী, দুর্ঘটনাও নিয়মিত। গত রোববার চট্টগ্রাম শহর থেকে রাঙ্গুনিয়ায় যাওয়ার পথে পাঁচটি এবং ফেরার পথে ছয়টি স্থানে যানজটে আটকা পড়েন এই প্রতিবেদক। নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী নুরুল আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাঙ্গুনিয়াবাসীর দুঃখ এই সড়ক। চার লেনে উন্নীত না করলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।’

চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কটি বর্তমানে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সড়ক হিসেবে পরিচিত। ঝুঁকিপূর্ণ অন্তত ৪০টি বাঁক, বেপরোয়া গতি ও সড়ক সংকীর্ণ হওয়ায় এখানে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র গেট থেকে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার রাঙ্গুনিয়া অংশে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। মুখোমুখি সংঘর্ষ ও গাছ পড়ে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে।

রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমদ ইমরানুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়া অংশ এখন কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সড়কটি চার লেনে উন্নীত হলে পর্যটন ও শিল্পায়নে রাঙ্গুনিয়া বড় অবদান রাখতে পারবে।

গুমাই বিল রক্ষার দাবি কৃষকদের

কাপ্তাই সড়ক ধরে মরিয়মনগর চৌমুহনী পার হলেই চোখে পড়ে গুমাই বিল। মরিয়মনগর থেকে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে উঠছে বিভিন্ন স্থাপনা ও ইটভাটা। এতে আশপাশের কৃষিজমিতে ধানের ফলনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

গত রোববার বিকেলে গুমাই বিলে আমন ধান রোপণ করছিলেন কৃষক নাছির উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাঘ মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সাধারণত রোপণ শেষ হয়। এবার ২৫ তারিখ পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। পানি না পাওয়ায় দেরি হয়েছে, এতে ফলন কমবে। গুমাই বিলের ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন স্থাপনা ও ইটভাটা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আলোচনায় ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও মোমবাতি

গত রোববার উপজেলার শান্তিরহাট থেকে শেষ সীমানা চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান পর্যন্ত অন্তত ১২টি স্থানে সরেজমিন ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী কিছুটা এগিয়ে আছেন। এরপরে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ টি এম রেজাউল করিম ও বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্টের বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী এম ইকবাল হাছান।

মানুষের কথার সঙ্গে মিলও পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম শহর থেকে কাপ্তাই সড়ক হয়ে রাঙ্গুনিয়ার প্রবেশমুখ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পার হতেই চোখে পড়ে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও মোমবাতির প্রার্থীর ব্যানারে ছেয়ে আছে। আর কিছুক্ষণ পরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় কখনো গানের সুরে আবার কখনো ভাই, ভাবি, চাচা সম্বোধন করে ভোট চাওয়া হচ্ছে। এই আসনে মোট আটজন প্রার্থী রয়েছেন। অন্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল্লাহ আল হারুন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রমোদ বরণ বড়ুয়া, আমার বাংলাদেশ পার্টির মো. আব্দুর রহমান, গণ অধিকার পরিষদের মো. বেলাল উদ্দীন ও জাতীয় পার্টির মো. মেহেদী রাসেদ। কিছু কিছু জায়গায় এসব প্রার্থীরও ব্যানার দেখা গেছে। তবে ওই তিন প্রার্থীর তুলনায় কম।

রাঙ্গুনিয়া গোডাউন এলাকায় দেখা যায় মিনিট্রাক, সিএনজি অটোরিকশায় মোমবাতির সমর্থকেরা স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন। পরে রোয়াজার হাট গরুর বাজার এলাকায় একটি মাঠে মোমবাতির প্রার্থীর জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। লোকজন জড়ো হওয়ায় পাশের কাপ্তাই সড়কেও যানজট লেগে যায়। আধুনিক রাঙ্গুনিয়া গড়তে প্রার্থী এম ইকবাল হাছান উপস্থিত লোকজনের কাছে ভোট চান।

সমাবেশে আসা নুরুল হকের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ, বিএনপিকে এত দিন মানুষ ভোট দিয়েছে। তারা কী করেছে দেখেছে। তাই এবার সুন্নি জোটের প্রার্থীকে ভোট দেবেন।

রোয়াজার হাট থেকে দুই কিলোমিটার দূরে রাঙ্গুনিয়া কলেজ মাঠে দেখা যায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ টি এম রেজাউল করিমের সমাবেশ চলছে। বক্তব্যে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে উত্তর ও দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ায় উন্নত মানের হাসপাতাল করবেন। যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পকারখানা স্থাপন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করবেন। প্রবাসী-অধ্যুষিত রাঙ্গুনিয়ার কেউ বিদেশে মারা গেলে বিনা খরচে লাশ যাতে দেশে আনতে পারেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে গুমাই বিল রক্ষাসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেন।

সমাবেশে ইছাখালী থেকে আসা আবু জাফরের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষের চিকিৎসাসহ নানা কাজে সহায়তা করেন শুনেছি রেজাউল করিম। তাই তাঁকে দেখতে এসেছি। তাঁকে ভোট দিলে লোকজনের উপকার হবে, তাই আমিও দেব।’

নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতের প্রার্থী এটিএম রেজাউল করিম। গত রোববার রাঙ্গুনিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে
ছবি: প্রথম আলো

ধানের শীষেরও সমর্থককে পাওয়া গেছে। তাঁদের একজন সরফভাটার ভূমিখীলের বাসিন্দা আবু সৈয়দ। গোডাউন ব্রিজ পার হয়ে ভূমিখীলের দিকে নেমে গেছে একটি কাঁচা সড়ক। গত রোববার দুপুরে আবু সৈয়দ সড়কটি দেখিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সড়কে প্রথম ইট বসানো হয়েছে প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উদ্যোগে। এরপর আর ইট বসেনি। তাই এবার তাঁর ছেলে হুমামকে আমরা ভোট দিব, যাতে বাবার মতো ছেলেও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।’ পেশায় কৃষক আবু সৈয়দ কোনো দল করেন না জানান।

নির্বাচিত হলে রাঙ্গুনিয়াবাসীকে নিরাশ করবেন না জানান হুমাম কাদের চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হবে নতুন শিল্প স্থাপন। আমাদের ওপর দিয়ে কাপ্তাই, রাঙামাটি, বান্দরবান যাওয়া যায়। এ অবস্থানকে কাজে লাগাতে না পারলে আমরা ব্যর্থ হব। রাঙ্গুনিয়ার সামাজিক শৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে এ উপজেলাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই। নদী, পাহাড়, সাফারি পার্ককে কেন্দ্র করে ইকো হোটেল, রিসোর্ট তৈরির স্বপ্ন আছে, বাস্তবায়ন করতে চাই।’

চট্টগ্রাম-৭ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩১ জন, নারী ১ লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ জন এবং হিজড়া ১ জন। আসনের ৯২টি ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তাঁরা।