ডুবে থাকা ধানখেতে নৌকা-কাস্তে নিয়ে কৃষক, অন্তত ঘরের খাবার তুলতে করছেন শেষ চেষ্টা

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার পাতারিয়া হাওরে পানিতে ডুবে থাকা ধান কাটছেন কৃষক। আজ রোববার সকালে তোলাছবি: প্রথম আলো

‘ডুবাইল থাকা ধান তেইক্কা যদি ঘরের খাওনের লাগি কিছু ধান তুলতাম পারি তই খুশি, অখন চেষ্টা করতাছি অন্তত ঘরের খাওনটা যাতে তুলতাম পারি।’ নিজের আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরের সিংগের বিল হাওরের কৃষক রমজান আলী (৫৫)।

রমজান আলীর মতো হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের এখন একটাই চেষ্টা—ডুবে থাকা জমি থেকে অন্তত পরিবারের খাবারের ধানটুকু ঘরে তোলা।

টানা বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল তলিয়ে গেছে। জেলার কৃষি বিভাগের হিসাবে, ছয় উপজেলার প্রায় ৪৫ শতাংশ বোরো জমি পানির নিচে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার হেক্টর জমির ধান। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক প্রায় ২০ হাজার।

গত এক সপ্তাহে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে জেলায়। এর সঙ্গে কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওরের পানি এসে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই, নবীগঞ্জের আংশিক, বাহুবল ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন হাওর প্লাবিত করেছে। জেলার বৃহত্তম গুংগিয়াজুরী হাওরও একইভাবে ডুবে আছে।

আজ রোববার সকালে বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর ইউনিয়নের সিংগের বিল হাওরে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও ভাসছে ধানের শিষ, কোথাও পুরো খেত ডুবে গিয়ে শুধু শিষের মাথা দেখা যাচ্ছে। পাশের পৈলারকান্দি, মন্দরী ও মক্রমপুর ইউনিয়নের হাওরেও একই চিত্র। হাওরের বুকজুড়ে ছোট ছোট ডিঙিনৌকা। তাতে দাঁড়িয়ে বা বসে কৃষকেরা ধান কাটছেন। কেউ কোমরসমান পানিতে নেমে কাস্তে চালাচ্ছেন। দেখে বোঝার উপায় নেই নিচে ফসলি জমি।

শতমুখা গ্রামের কৃষক শামছু মিয়া (৫০) ভিজে গামছা মাথায় বেঁধে ধান কাটছিলেন। তিনি বলেন, ‘ভাই, এভাবে ধান কাটতে হবে কখনো ভাবিনি। জমি তো চোখেই পড়ে না, আন্দাজে কাটতেছি।’

আরও পড়ুন

একই এলাকায় নৌকায় বসে ধান কাটছিলেন সাইদুল হক। মাঝেমধ্যে ঢেউয়ে নৌকা দুলে উঠছে, তবু কাজ থামছে না। তিনি বলেন, পানি যদি ৭ দিন থেকে ১০ দিন পরে আসত, তাহলে অন্তত ঘরের খাওয়ার ধানটা কাটা সম্ভব হতো। এখন তো ডুবে থাকা ধান তোলা কঠিন হয়ে গেছে শ্রমিক–সংকটে।

হাওরের অন্য প্রান্তে কয়েকজন মিলে দল বেঁধে ধান কাটছিলেন। একজন কাটছেন, আরেকজন নৌকায় তুলছেন। তাঁদের চোখেমুখে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। একজন কৃষক বলেন, ‘এক বছর খাটছি এই জমির জন্য। এখন যদি সব পানিতে ডুবে যায়, তাহলে সংসার চলবো কীভাবে?’

ষাটোর্ধ্ব কৃষক আইযুব আলী নৌকায় বসে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি বলেন, ‘হাওরের মানুষ পানির সঙ্গে লড়াই করতে জানে; কিন্তু এবার পানি খুব তাড়াতাড়ি আইছে। এই ক্ষতি পুষানো কঠিন।’

আরও পড়ুন

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসেড’–এর জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পের পরিচালক নির্মল কুমার বিশ্বাস বলেন, তাঁদের জরিপে দেখা গেছে, জেলার ছয় উপজেলায় আগাম বন্যায় বড় ক্ষতি হয়েছে। শুরুতে কিছু কৃষক ধান কাটতে পারলেও তা ২৫ শতাংশের বেশি নয়। তাঁর মতে, স্বল্পকালীন ধানের জাত ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চাষ করলে ক্ষতি কিছুটা কমানো যেত।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক দিপুল কুমার পাল জানান, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হাওরাঞ্চলে। তবে আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে এখনো ১০ থেকে ১২ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো চলছে।

আরও পড়ুন