সুন্দরবনে দস্যুতা : ৮২ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেলেন ১৩ মৌয়াল
খুলনার কয়রা উপজেলা থেকে মধু আহরণে সুন্দরবনে যাওয়া ১৩ জন মৌয়াল বনদস্যুর হাতে জিম্মি হয়ে দুই দিন আটক থাকার পর মুক্তি পেয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘দুলাভাই বাহিনী’ পরিচয় দেওয়া দস্যুরা তাঁদের মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নৌকার সব মালামাল লুট করে নেয়। পরে ৮২ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাঁরা ছাড়া পেয়েছেন।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী মৌয়ালরা বাড়ি ফেরেন। আজ রোববার দুপুরে কয়রা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন ভুক্তভোগীরা।
মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা ১৩ জন মৌয়াল হলেন কাটাখালী গ্রামের হারুন গাজী ও আবদুল গফুর গাজী, বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলাম, পরিমল চন্দ্র সরকার, চরণ সরকার, মালেক গাজী, আফতাব আলী, খোকন মণ্ডল, মহানন্দ মণ্ডল, কালাম গাজী, পিরআলী গাজী, খোদাবক্স গাজী ও হান্নান গাজী।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার বন বিভাগের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন থেকে পাস-পারমিট নিয়ে তাঁরা সুন্দরবনে যান। সন্ধ্যায় শিবসা নদী পেরিয়ে বনের কুমড়োকাঠি খাল এলাকায় পৌঁছালে অস্ত্রধারী দস্যুরা তাঁদের দুই নৌকা ঘিরে ফেলে। পরে জোর করে তাঁদের জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যায়।
মৌয়াল হারুন অর রশীদ বলেন, জঙ্গলের ভেতর থেকে অস্ত্র তাক করে নৌকা থামানো হয়। পরে দস্যুরা নিজেদের ‘দুলাভাই বাহিনী’ পরিচয় দিয়ে প্রথমে নৌকার সব টাকাপয়সা নিয়ে নেয় এবং পরে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। তিনি বলেন, দস্যুরা তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বাধ্য করে। দস্যুরা চলে যাওয়ার সময় তাদের দলের একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়েছে। সেখানে থাকা ফোন নম্বরে ভবিষ্যতে সুন্দরবনে ঢোকার আগে যোগাযোগ করতে বলেছে।
মৌয়াল খোকন মন্ডল বলেন, ‘আমাদের দুটি নৌকার মৌয়ালদের জিম্মি করার পর রাত প্রায় ৯টার দিকে ডাকাতদের একজন এসে বলল, “প্রত্যেক নৌকা থেকে একজন করে গার্জিয়ান আমাদের ট্রলারে আসো। দুলাভাই ডাকছে।” তখন আমাদের নৌকা থেকে আমি গেলাম। যাকে সবাই “দুলাভাই” বলে ডাকছিল, সেই ডাকাত বলল, “দেড় লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা না দিলে কাউকে ছাড়া হবে না”।’
খোকন মন্ডল আরও বলেন, ‘পরে সবাই মিলে মোট ৮২ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পাই। তবে শুধু মুক্তিপণের টাকা না, আমাদের কাছে যা কিছু ছিল, সব নিয়ে গেছে। প্রত্যেকের পকেটে থাকা খুচরা টাকা পর্যন্ত তল্লাশি করে নিয়ে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের কাপড় খুলে তল্লাশি করেছে। শরীরের ভেতরে কোথাও টাকা লুকানো আছে কি না, তা দেখার জন্য সবাইকে কাপড় ছেড়ে দাঁড় করিয়েছে। কাউকে ছাড় দেয়নি। আমি বয়স্ক মানুষ, আমাকেও রেহাই দেয়নি।’
ভুক্তভোগীরা জানান, মুক্তি পাওয়ার পর নৌকা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলে তাঁরা আরেকটি দস্যুদল ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’র মুখোমুখি হন। মৌয়াল গফুর গাজী বলেন, ‘জাহাঙ্গীর বাহিনীর লোকজনের কাছে আমরা বলি, দুলাভাই বাহিনী দুই দিন ধরে আমাদের আটক করে রেখেছিল। আমাদের কাছ থেকে সব টাকাপয়সা ও মালামাল নিয়ে গেছে। একটু আগেই ছেড়ে দিয়েছে।’
মৌয়াল গফুর বলেন, ‘দস্যু জাহাঙ্গীর তখন জানতে চায়, দুলাভাই বাহিনী কোন খালে আছে। আমরা বলি, কুমড়োকাঠি খালে। এরপর তারা আর আমাদের দিকে খেয়াল করেনি। জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা দ্রুতগতিতে ট্রলার চালিয়ে কুমড়োকাঠি খালের দিকে চলে যায় দুলাভাই বাহিনীকে ধরতে। পরে দুই বাহিনীর মধ্যে মুখোমুখি কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা আমরা আর জানি না। আমরা তখন দ্রুত নৌকা বেয়ে বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশনের দিকে চলে আসি।’
ভুক্তভোগী মৌয়ালদের ভাষ্য অনুযায়ী, জলদস্যু দুলাভাই বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, কয়রার আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. হাসানের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ আছে। তবে এই অভিযোগকে ষড়যন্ত্র দাবি করে হাসান বলেন, ‘সুন্দরবনের দুলাভাই বাহিনীর সদস্য আফজালের শ্বশুরবাড়ি আমাদের গ্রামে। তাঁর শ্বশুরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্যক্তিগত বিরোধ চলছে। সেই শত্রুতার জের ধরেই আমাকে এ ঘটনায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে অতীতে দস্যু আফজাল ও তার শ্বশুর একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল। তারা মনে করে, ওই ঘটনায় আমার হাত ছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালায় তারা।’
কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, আজ দুপুরে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা মৌয়ালরা থানায় এসে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে তাঁরা যে স্থানে জিম্মি হয়েছিলেন, তা খুলনার দাকোপ থানার আওতাধীন এলাকায় পড়েছে। বিষয়টি জেনেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।