নির্বাচনী পরিবেশ আপাতত শান্ত, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৮। এবার নতুন ভোটার হয়েছেন ২৩ হাজার ৬৮ জন।

চায়ের দোকানে চলছে জমজমাট নির্বাচনী আড্ডা। গতকাল বেলা একটায় চট্টগ্রামের রাউজানের কচুখাইন এলাকায়ছবি: সৌরভ দাশ

চায়ের দোকানে সকাল থেকেই লোকসমাগম। নানা বয়সী মানুষের আসা-যাওয়া। দুপুরের দিকে জমজমাট আড্ডা। স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় নির্বাচন। দীর্ঘদিন পর নির্বাচনী আমেজ ফিরে আসায় কেউ সন্তুষ্ট, আবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিবেশ শান্ত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয়। আবার কারও কারও জিজ্ঞাসা, নির্বাচন হবে তো?

তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত। সেটা হলো, গণভোট নিয়ে ধারণা অস্পষ্ট। প্রচার চললেও গণভোটের বিষয়বস্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না গ্রামের মানুষ। প্রার্থীদের কেউ কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানালেও কী বিষয়ে এই ভোট, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই গ্রামের মানুষের।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কচুখাইন এলাকায় একটি চায়ের দোকানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এমনই আলোচনা শোনা যায়। এ উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৬ আসনে এবারের নির্বাচনে চার দলের চার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রচার শুরু করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে মাইকিং, বিলি করা হচ্ছে প্রচারপত্র, ঝুলছে ব্যানার।

নির্বাচনী পরিবেশ জানতে–বুঝতে রাউজানের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখি। কথা হয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচন ছিল একতরফা ও বিতর্কিত।

রাতের ভোট নিয়ে ক্ষোভ

কচুখাইন গ্রামের চায়ের দোকানের আড্ডায় ছিলেন সাত ব্যক্তি। তাঁদের একজন মো. ইদ্রিস (৭২) নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করেন। আগের নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে গিয়ে কী পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। চট্টগ্রামের ভাষায় তিনি যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায়, ‘একবার তো রাতের আঁধারে ভোট হয়ে গিয়েছিল। সকালে কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারিনি। গতবারও (২০২৪–এর ৭ জানুয়ারি) ভোট দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু একটি দলের লোকজন বলে, এক শর্তে ভোট দিতে পারবেন, প্রকাশ্য সিল মারতে হবে। তাই আর ভোট দেইনি।’

তবে এবার পরিস্থিতি বদলেছে বলে মনে করেন মো. ইদ্রিস। এতে সায় দেন আড্ডায় থাকা অন্যরাও। তাঁদের একজন ওষুধের দোকানি মাহবুব হাসান বলেন, এবার মনে হচ্ছে ভোট সুষ্ঠু ও অবাধ হবে। অনেক দিন পর ভোটের পরিবেশ ফিরেছে। কারও জোরজবরদস্তি নয়, এবার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চান তিনি।

৬৭ বছর বয়সী শফিউল আলম বলেন, একেকজনের একেক প্রার্থী পছন্দ। তবে যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিতে চান তাঁরা। এবার মনে হয় সে সুযোগ এসেছে।

পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

চায়ের কাপ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে এলেও আড্ডার উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছিল। একজন ছাড়া সবাই একমত, প্রচারের পর থেকে রাউজানের নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত। প্রার্থীদের সমর্থকেরাও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলছেন সবাই। এতে ভোট শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদী তাঁরা। তবে শেষ মুহূর্তে পরিবেশ কেমন থাকে, তা নিয়ে সংশয় আছে তাঁদের।

কেন এ সংশয়? কারণ, ২০২৪–এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হঠাৎ অশান্ত হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা। একের পর এক গোলাগুলি ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটতে থাকে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, কখনো ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৭ মাসে এভাবে ১৯ জন খুন হয়েছেন এ উপজেলায়। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ। হতাহত ব্যক্তিরা বেশির ভাগই বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী। এর মধ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড অন্তত ১২টি।

নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর খুনের ঘটনা ঘটেনি। তবে মানুষের মনে শঙ্কা আছে। সেটি যেমন কচুখাইনের চায়ের দোকানে থাকা ব্যক্তিদের মনে, তেমনি উপজেলার অন্যান্য এলাকার মানুষের মধ্যেও।

চায়ের দোকানে থাকা ওসমান গনি নামের এক ব্যক্তি ক্ষোভ ঝেরে বলেন, একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঠিক নেই। নৈরাজ্যকর অবস্থা। এমন অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব?

চাকরিজীবী আবদুল খালেক (৬৪) ও গাড়িচালক জাহিদুল হক (৪৮) সংশয় প্রকাশ করে বলেন, এখন পর্যন্ত পরিবেশ ঠিক আছে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু কখন কী হয় তা কেউ জানে না। পরিস্থিতি খারাপ হতে কতক্ষণ!

 কচুখাইন থেকে আড্ডা শেষে তিন কিলোমিটার দূরে নোয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা হয় এক বেসরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে।

নির্বাচন নিয়ে আলাপের এক পর্যায়ে জানা যায়, তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। ভোট দিতে যাবেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাবেন, না গিয়ে উপায় নেই। যদি কেন্দ্রে না যান, তাহলে প্রতিপক্ষের লোকজন নানা ধরনের ঝামেলা করতে পারেন। এত ঝুটঝামেলার দরকার কী?

পরিস্থিতি আপাতত শান্ত

চট্টগ্রামের রাউজানে খুনোখুনি-গোলাগুলিসহ সহিংসতার ঘটনার নেপথ্যে কারণ হিসেবে ছিল চাঁদাবাজি, দখলবাজির ঘটনা। কর্ণফুলী ও হালদা নদীর বালুমহাল, ইট-ভাটাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে চাঁদার ভাগ–বাঁটোয়ারা, রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটে এ উপজেলায়। কখনো দিনে, কখনো রাতে—সন্ত্রাসীরা খুন করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি আপাতত শান্ত মনে হলেও মানুষের মনে উৎকণ্ঠা রয়ে গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক হারুনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ভোটার হিসেবে তাঁদের চাওয়া তেমন বেশি কিছু না। যিনি জয়লাভ করবেন, যে দল জয়ী হবে, তাদের কাছে প্রত্যাশা, রাউজানকে যেন চাঁদাবাজ ও দখলদার মুক্ত করে। বালুমহাল নিয়ে, ইটভাটা নিয়ে, জমি নিয়ে হানাহানি বন্ধ চান তাঁরা। মানুষ শান্তিতে বাঁচতে চান। সন্ত্রাসীরা হয়তো এখন প্রকাশ্যে নেই। আত্মগোপন থেকে তো যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসতে পারে। তাই আগামী সরকারকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে।

সম্প্রতি রাউজানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। উপজেলায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এলাকার লোকজনও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।

তবে এসব ঘটনা নিয়ে ভাবতে চান না পশ্চিম গুজরার মগদাই এলাকার বাসিন্দা সুকুমার দাশ। তিনি বলেন, এ ধরনের কিছু ঘটনার কথা শুনেছেন। তবে তাঁদের এলাকায় সব সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন। ভবিষ্যতেও থাকবেন। প্রার্থীরাও প্রচারে এসে তা নিশ্চিত করেছেন।

মগদাই এলাকায় প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর মো. শাহজাহান মঞ্জুর নির্বাচনী কার্যালয় দেখা গেল পাশাপাশি। এলাকার মানুষও বলছেন, প্রার্থীদের মধ্যে এবার কাদা–ছোড়াছুড়ি নেই। নিজেদের মতো করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাউজানের চার প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাড়ির পাশে চায়ের দোকান রয়েছে আবদুল মজিদের। চায়ের দোকানের পাশাপাশি কৃষিকাজও করেন তিনি। তিনি বলেন, চাষবাস নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। সার থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বাড়তি। নতুন সরকার যেন এদিকে নজর দেয়।

প্রথম ভোট, প্রত্যাশা অনেক

১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে চট্টগ্রাম-৬ আসন। এখানে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৮। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৭১ ও নারী ১ লাখ ৬১ হাজার ১৭ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৯৫। ভোটকক্ষ ৬৭৩টি।

এবার নতুন ভোটার হয়েছেন ২৩ হাজার ৬৮ জন। তাঁদের একজন নোয়াপাড়া কলেজের ছাত্র ফয়সাল বিন নাছির বলেন, রাজনীতিবিদের ওপর আস্থা কম। তাঁরা ঠিক থাকলে তো দেশের এ অবস্থা হতো না। কাকে ভোট দেবেন—জানতে চাইলে বলেন, যিনি শিক্ষা নিয়ে কাজ করবেন, এলাকার উন্নয়ন করবেন তাঁকেই ভোট দেবেন।

 একই কলেজের ছাত্রী নাদিয়া ইসলামও এবার প্রথম ভোট দেবেন। তাঁর প্রত্যাশা, নির্বাচিত সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

আগে ভোটার হলেও কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি কলেজছাত্র অমি বিশ্বাস। তবে এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা কাজ করবে না বলে মনে করেন তিনি। বলেন, আগামী সরকারের কাছে অনেক প্রত্যাশা। তারা মা-বোনদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করবে। মানুষ যাতে শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, সে জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে।

নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের স্নাতক (পাস) কোর্স সম্পন্ন করেছেন মোহাম্মদ হাসান। আগামী দিনের প্রত্যাশা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশি কিছু চাওয়া নেই। নতুন সরকার যেন বাক্‌স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। মানুষ যেন নির্বিঘ্নে-নির্ভয়ে তাঁদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন।