আমিষের চাহিদা মেটাতে না, মানুষ পাখি খায় শখে; এটা দুঃখজনক

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার হাওর ও বিলে বকসহ দেশীয় পাখির বিচরণ আছে। সামনেই শীতকাল। তখন এসব হাওর-বিলে অতিথি পাখিদের বিচরণ বাড়বে। ইতিমধ্যে পাখি শিকারিদের অপতৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। স্থায়ীয় হাট-বাজারে শিকার করা পাখি বিক্রিও চলছে। এ সব নিয়ে প্রথম আলো কথা বলেছে গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিলুর রহমানের সঙ্গে।

সিলেটের গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিলুর রহমান
ছবি: প্রথম আলো

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: গোয়াইনঘাটে অসংখ্য হাওর ও জলাশয় আছে। সেখানে অনেক দেশি পাখির বিচরণ। অভিযোগ আছে, এসব হাওরে প্রতিদিনই শিকারিরা পাখি শিকার করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করে থাকেন। এসব ঠেকাতে কী করবেন?

তাহমিলুর রহমান: পাখি শিকার বন্ধে প্রথমেই স্থানীয় মানুষের সচেতনতা প্রয়োজন। অনেকে শখের বশেও পাখি শিকার করেন। জালের ফাঁদ, মাছ ধরার বড়শিসহ নানা দেশীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কখনো এয়ারগান ব্যবহারের কথাও শোনা যায়। তবে আমরা প্রতি গ্রামের পাখি শিকারিদের তালিকা করেছি এবং তাঁদের চিহ্নিত করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশসহ অভিযান চালাচ্ছি। গত কয়েক দিনে একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির ৩৫টি দেশীয় পাখি উদ্ধার করা হয়েছে। এতে গ্রামের মানুষ সচেতন ও সতর্ক হচ্ছেন। আর পাখি শিকার ও বেচাকেনা বন্ধে উপজেলার গ্রামীণ হাট-বাজারে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ইজারাদারদের আমরা সতর্ক করে দিচ্ছি। কোনো বাজারে পাখি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: সামনে শীত মৌসুম। সুদূর সাইবেরিয়া থেকে পরিযায়ী পাখিরা অন্যান্য বছরের মতো এবারও নিশ্চয় গোয়াইনঘাটের হাওরে আসা শুরু করবে। এসব পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হবে এখানকার হাওর-জলাশয়। শিকারিদের হাত থেকে এসব পাখি রক্ষা করবেন কীভাবে?

তাহমিলুর রহমান: গোয়াইনঘাট উপজেলায় ১৪৫টি জলমহাল আছে। শীতকালে অনেক অতিথি পাখি এসব জলাশয়ে আসে। এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিলের সম্পূর্ণ পানি সেচে মাছ ধরা। শীতকালে এই জলাশয়গুলোতে মাছ ধরা হয়, সম্পূর্ণ পানি নিষ্কাশনের ফলে জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। এ বছর আমরা পর্যবেক্ষণ জোরদার করছি। কোনো জলাশয়কে এ বছর পানিশূন্য হতে দেওয়া হবে না। এতে শীতে পাখির আবাসস্থল নিরাপদ হবে।

এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের পাখি ও প্রকৃতির প্রতি সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় এক বাজারে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীকে পাখি বিক্রি করতে দেখা যায়। উপজেলা প্রশাসনের এক অভিযানে বিষয়টি ধরা পড়ে। ওই খুদে শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তার চাচাতো ভাই লজেন্স কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজারে পাখিগুলো বিক্রি করতে দিয়েছে। ওই শিক্ষার্থীকে আমার সংগ্রহে থাকা পাখির ওপর লেখা একটি বই উপহার দিয়েছি। দেখলাম, সে খুবই অবাক হয়েছে। বইয়ে থাকা পাখির ছবি দেখে সে বলেছে, কোন কোন পাখি সে বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করেছে। তাকে বুঝিয়ে বলার পর সে বলেছে, আর কখনো সে পাখি বিক্রি করবে না।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: অনেকে পাখি কিনতে সিলেট শহর থেকে গোয়াইনঘাটের গ্রামীণ হাট-বাজারে যান...

তাহমিলুর রহমান: পাখি খাওয়ার বিষয়টি না থাকলে হাট-বাজারে এভাবে কখনো পাখি বিক্রি হতো না। এলাকার অনেকেই বাড়িতে মেহমান এলে বাজারে পাখির খোঁজ করেন। বিষয়টি খুবই অন্যায়। পাখি হত্যা কখনো কোনো আনন্দ উদ্‌যাপনের মাধ্যম হতে পারে না। আমিষের চাহিদা মেটানো বা ক্ষুধা নিবারণে কেউ পাখি খায় না। আসলে অনেকে শখ করে পাখি খান। এটা খুবই দুঃখজনক ও পীড়াদায়ক। এ মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারলে বাজারে কেউ পাখি বিক্রি করতে আসবে না।

প্রশ্ন :

প্রথম আলো: পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, গোয়াইনঘাটের পার্শ্ববর্তী উপজেলা জৈন্তাপুরের হরিপুর এলাকায় একাধিক রেস্তোরাঁ আছে, যেখানে নিয়মিত পাখির মাংস বিক্রি হয়। পাখির মাংস খেতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভিড় করেন। এর সমাধান কী?

তাহমিলুর রহমান: পাখি শিকার যে করা হচ্ছে, এর প্রমাণ তো শীত আসার সঙ্গে সঙ্গেই পাচ্ছি। অবশ্য বর্ষায় তেমন উদাহরণ পাওয়া যায় না। আমরা সবার কাছে তথ্য চাইছি—কে পাখি শিকার করেন, কোথায় বিক্রি হয়, কোথায় খাওয়া হয়, এমনকি কার বাড়িতে কোন উপলক্ষে পাখি খাওয়ার আয়োজন হয়েছে; সেগুলো আমাদের জানান। মানুষ আমাদের এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। তথ্য পাওয়ামাত্রই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।