কাঁঠাল নিয়ে সরগরম গাজীপুর
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গাজীপুরের শ্রীপুরের গ্রামীণ পথগুলোতে এখন শুরু হয় এক ভিন্ন রকমের ব্যস্ততা। পাকা কাঁঠালের মিষ্টি ঘ্রাণে চারপাশ যেন ভরে ওঠে। কেউ মাথায় করে, কেউ ভ্যান বা ঠেলাগাড়িতে করে কাঁঠাল নিয়ে ছুটছেন বাজারে। পাইকার–ক্রেতাদের ভিড়, দরদাম ও কাঁঠাল গাড়িতে ওঠানোর হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এ চিত্র শুধু বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়ে বাগানজুড়েও। ভোরে বাগানে বাগানে ঢুকলে চোখে পড়ে পাইকারদের ব্যস্ততা। কেউ গাছের কাঁঠাল গুনছেন, কেউ আকার-আকৃতি দেখে দাম নির্ধারণ করছেন। দরদাম চূড়ান্ত হলে সেখানেই বিক্রির কাজ হয়ে যায়। ফলে অনেক কৃষককে আর বাজারে যেতে হয় না, গাছেই বিক্রি হয়ে যায় পুরো মৌসুমের ফলন।
শ্রীপুরের কাঁঠাল মিষ্টি ও সুগন্ধি হওয়ায় বাজারে খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতারা নাম শুনেই তা কিনতে আগ্রহ দেখান।
কাঁঠালের রাজধানীখ্যাত গাজীপুরের প্রায় সব এলাকায় কমবেশি ফলটি চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় শ্রীপুরে। কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া আর কালীগঞ্জেও চাষ হয়। দীর্ঘদিনের সুনাম, স্বাদ ও ঘ্রাণের স্বকীয়তার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে গাজীপুরের কাঁঠাল ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা লাভ করে। কাঁঠাল ঘিরে মৌসুমজুড়ে জমে ওঠা বাণিজ্য, কৃষকের ব্যস্ততা ও স্থানীয় উদ্যোগে শ্রীপুর দেশের অন্যতম পরিচিত কাঁঠাল উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বছরে উৎপাদন ৭৮ হাজার টন
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, অঞ্চলটিতে বছরে গড়ে প্রায় ৭৮ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। এখানে প্রধানত খাজা, গালা ও দুরসা জাতের কাঁঠাল ব্যাপকভাবে চাষ হয়। চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে খাজা জাতের কাঁঠাল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির পরিকল্পনার তথ্যও জানা গেলে কৃষি অফিস থেকে।
শ্রীপুরে জৈনা বাজার এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় কাঁঠালের হাট হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া শ্রীপুরের নগরহাওলা, চকপাড়া, টেপিরবাড়ি, রাজাবাড়ি, ছাতির বাজার, কেওয়া ও চন্নাপাড়া এলাকায় কাঁঠাল ঘিরে ব্যস্ততা বর্তমানে চোখে পড়ার মতো।
কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেল, সড়কের পাশে কাঁঠাল স্তূপ করে রাখা। পাইকারেরা কিনে ভ্যানে ও ট্রাকে তুলে কাঁঠাল পাঠিয়ে দিচ্ছেন আড়ত আর বড় পাইকারি বাজারে। সেখান থেকে কাঁঠাল কিনে নিয়ে যান বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ক্রেতারা।
জৈনা বাজারে কাঁঠালের দামের বিষয়ে কথা হয় পাইকারি ব্যবসায়ী আবুল কালামের সঙ্গে। তিনি জানালেন, মাঝারি আকারের ১০০ কাঁঠালের লট ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় কাঁঠাল ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার আর ছোট কাঁঠাল ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা।
গাজীপুর সদরের পিরুজালী গ্রামের বাসিন্দা ও কাঁঠাল ব্যবসায়ী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, তাঁদের গ্রামে প্রতিবছর প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হয়। এসব কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করতে পারলে ফলটি বেশি লাভজনক হতে পারে।
‘শ্রীপুরের কাঁঠাল বেশি মিষ্টি’
শ্রীপুরের কাঁঠালের কদর বেশি হওয়ার কারণ এর মিষ্টতা, সুগন্ধ, কম আঁশ ও আকর্ষণীয় রং। এখানকার মাটি ও জলবায়ু কাঁঠাল চাষের উপযোগী হওয়ায় স্বাদ ও মানে অনন্য। গাজীপুরে অবস্থিত জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও কাঁঠালের উন্নত জাত উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বারি-১, বারি-২, বারি-৩, বারি-৪, বারি-৫সহ বেশ কয়েকটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত উচ্চ ফলনশীল, সুস্বাদু ও বাণিজ্যিক চাষের উপযোগী।
শ্রীপুরের কাঁঠালের পাইকার মো. শাহাবুদ্দিন ভাঙ্গি বলেন, তিনি এপ্রিলে শতাধিক কাঁঠালগাছ কিনে রেখেছেন। কাঁঠাল বিক্রি করছেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তিনি বলেন, এ দেশে সবচেয়ে বেশি মিষ্টি কাঁঠাল কেবল শ্রীপুরেই পাওয়া যায়।
ক্রেতারাও শ্রীপুরের কাঁঠালের স্বাদে অনেক সন্তুষ্ট। ঢাকা থেকে কাঁঠাল কিনতে আসা ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, শ্রীপুরের কাঁঠাল মিষ্টি ও সুগন্ধি হওয়ায় বাজারে খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতারা নাম শুনেই তা কিনতে আগ্রহ দেখান।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বলেন, ‘কাঁঠাল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা নিয়ে কাজ করা হবে। কাঁঠালের আচার তৈরি ও রেডি টু কুকের জন্য পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে রপ্তানির জন্য আমরা কাজ করছি।’
তবে কাঁঠালগাছ কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানালেন সদরের মেম্বারবাড়ি এলাকার নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন করে কাঁঠাল রোপণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এটা না হলে গাজীপুর তার কাঁঠালের ঐতিহ্য একসময় হরিয়ে ফেলবে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভুঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, গাজীপুর হচ্ছে কাঁঠালের রাজধানী। বর্তমানে এখানে কাঁঠালের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাজার রয়েছে। আমরা কাঁঠাল ও এর প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছি। এটি সফল হলে এই বাজার ২ হাজার কোটিতে নেওয়া সম্ভব।