ছেলের লাশ কাটাছেঁড়া না করার বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছে পুলিশ, অভিযোগ বাবার

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে নিহত মামুন আলীর বাবা সেকেন্দার আলীছবি: প্রথম আলো

ডাবগাছ থেকে পড়ে গিয়ে মামুন আলী (৩০) মারা গেছেন। বাবা সেকেন্দার আলী চান না মৃত্যুর পরও ময়নাতদন্তের সময় তাঁর ছেলের লাশ কাটাছেঁড়া হোক। থানায় লিখিত দিয়েছেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু লাশের ময়নাতদন্ত না করার জন্য পুলিশ সেকেন্দারের কাছে ১০ হাজার টাকা চেয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। আজ বুধবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

সেকেন্দার আলী পেশায় নৈশ প্রহরী। তাঁর বাড়ি রাজশাহী নগরের চন্দ্রিমা থানার দায়রাপাক এলাকায়। সেকেন্দারের ছেলে মামুন আলী গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এলাকার এক ব্যক্তির গাছে ডাব পাড়তে উঠেছিলেন। অসাবধানতাবশত সড়কের পাশেই কংক্রিটের ফুটপাতে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ভোর পাঁচটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

স্বজনেরা জানান, কোনো অভিযোগ নেই বলে মৃত্যুর পর তাঁরা মামুনের মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে চাননি। কিন্তু চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম এক উপপরিদর্শক (এসআই) ও দুই কনস্টেবলকে হাসপাতালে পাঠিয়ে তাঁদের কাছে ১০ হাজার টাকা চান। নাসির উদ্দিন নামের ওই এসআইকে সেকেন্দার আলী জানিয়ে দেন, তিনি টাকা দিতে পারবেন না। ছেলের লাশ কাটা হলে তিনি গ্রহণও করবেন না। পুলিশকেই লাশ নিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। তারপরও ময়নাতদন্তের জন্য মামুনের লাশ হাসপাতাল থেকে মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তখন স্বজনেরা মর্গের সামনে থেকে চলে যান। পরে পুলিশ ফোন করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নেওয়ার জন্য ডাকে। এরপর ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনেরা মর্গ থেকে মামুন আলীর লাশ নিয়ে বাড়ি যান।

আজ বেলা আড়াইটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে গিয়ে দেখা যায়, লাশ কাটা ঘরে মামুন আলীর লাশ রাখা আছে। বাইরে স্বজনেরা লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন এসআই নাসির উদ্দিন। তাঁর সঙ্গে আছেন এক নারী কনস্টেবলসহ দুই পুলিশ সদস্য। সেকেন্দার আলীর ভাগনে আয়নাল হক এসআই নাসির উদ্দিনের সামনেই বলতে থাকেন, ‘ওসির কথা বলে এই এসআই ১০ হাজার টাকা চেয়েছেন। তা না হলে লাশ কাটা হবে বলেছেন।’

টাকা চাওয়ার অভিযোগের কথা শুনে কোনো কিছু না বুঝেই একজন ডোম বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু করে দেন। তিনি বলতে থাকেন, লাশ কাটার জন্য তাঁরা ৬৫০ টাকা চেয়েছেন। ১০ হাজার টাকার কথা কেন বলা হচ্ছে? তখন তাঁকে বুঝিয়ে বলা হয়, ১০ হাজার টাকা পুলিশের কথা বলা হচ্ছে। এরপর ওই ডোম শান্ত হন।

মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় নিহত মামুন আলীর বাবা সেকেন্দার আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পইড়ে গেলছে, মইরে গেলছে। কুনু দাবি আছে বুলেন তো? থানাতেই বুইলে আইস্যাছি যে ছেইলে মারা গেলছে পোস্টমাডাম (ময়নাতদন্ত) কইরতে হবে না। লিয়ে গিয়ে মাটি দিব। সহি–স্বাক্ষর কইরে এইখানে আইসেছি। এইখানে টাকা চাহিছে, ১০ হাজার টাকা দ্যাও, না হোলে পোস্টমাডাম হবে। বুলেছি, পোস্টমাডাম কইরলে লাশ লিব না। ফেলে দেন গা বুলেছি। তাই পোস্টমাডাম ছাড়াই লাশ দিল। মোবাইল কইরে ডাইকছে যে লাশ লিয়ে যান।’

লাশ কাটা ঘরের সামনেই ওসির নামে টাকা চাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় এসআই নাসির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভিত্তিহীন, ভিত্তিহীন। অভিযোগ ভিত্তিহীন। তদন্ত করে দেখেন। একটা অপমৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে। মামলা রুজু হওয়ার পর যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। এখন বিনা ময়নাতদন্তে লাশ হস্তান্তর করা হবে।’

তাঁর সামনেই স্বজনেরা এমন অভিযোগ করছেন বললে এসআই বলেন, ‘বললেই তো সত্য হবে না। পুরোপুরি মিথ্যা অভিযোগ। যদি মিথ্যা হয়, অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে আমরা লিগ্যাল অ্যাকশন নেব।’

যোগাযোগ করা হলে চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টা ওই রকম নয়। ওরা পোস্টমর্টেম করাবে না। আর আমরা বলেছি যে পোস্টমর্টেম না করে লাশ হস্তান্তর করব না। এই জন্য তারা একটা মিথ্যা অভিযোগ খাড়া করেছে।’ তারপরে তো পোস্টমর্টেম না করেই লাশ দিয়েছেন, কেন দিলেন জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘ওরা লাশ নেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল। তখন দেখলাম যে অভিভাবক না থাকলে এই লাশ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এসব কথা চিন্তা করেই পোস্টমর্টেম না করেই লাশ দিয়েছি।’