বিদেশি আম চাষে বদলে গেল খালেকুজ্জামানের জীবন

নিজের বাগানে আম পরিচর্যায় ব্যস্ত খালেকুজ্জামান প্রামাণিক। সম্প্রতি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের প্রামাণিকপাড়া গ্রামেছবি: প্রথম আলো

চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই বেছে নিয়েছিলেন খালেকুজ্জামান প্রামাণিক। সেই সিদ্ধান্তই আজ তাঁকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের প্রামাণিকপাড়া গ্রামে।

প্রামাণিকপাড়া গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি আমগাছ। কোথাও লালচে আভাযুক্ত মিয়াজাকি, কোথাও বেগুনি রঙের কিউজাই, আবার কোথাও হলুদ কিংবা সবুজ রঙের নানা জাতের আম। ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে অনেক ডাল। এসব বিদেশি আম দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের উপজেলা থেকে শুরু করে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন।

প্রায় এক যুগ আগে দুই একর জমিতে শুরু করা খালেকুজ্জামান প্রামাণিকের আম চাষ এখন ১০ একরে বিস্তৃত। আমের বাগানের সঙ্গে মাছ, গাভি ও ছাগলের খামার গড়ে তুলে তিনি হয়েছেন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তাঁর দেখানো পথ ধরে এলাকার অনেক তরুণও এখন কৃষিকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে খালেকুজ্জামানের মাসিক আয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। তাঁর খামারে কাজ করে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও ১২ জনের।

খালেকুজ্জামানেরা চার ভাই–বোন। তাঁর জন্ম ১৯৮৪ সালে। বাবা শামসুল হক ছিলেন সচ্ছল কৃষক। ২০০৭ সালে ডিগ্রি পাস করার পর পরিবার ও স্বজনদের অনেকেই চাকরির চেষ্টা করতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল নিজের কিছু করার। সেই ভাবনা থেকেই কৃষিকে বেছে নেন তিনি।

২০১০ সালের জুনে মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ গ্রামের কৃষক বাবলু মিয়ার আমবাগান দেখতে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান পান খালেকুজ্জামান। বাবলু মিয়ার সফলতার গল্প তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। পরে তাঁর কাছ থেকেই আধুনিক আম চাষের নানা কৌশল শেখেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বাবার দেওয়া দেড় লাখ টাকা নিয়ে দুই একর জমিতে দেশি-বিদেশি জাতের আমের চারা রোপণ করেন। তিন বছর অপেক্ষার পর আসে প্রথম ফলন। প্রথম বছরেই আম বিক্রি করে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়। সেই সাফল্যই তাঁকে নতুন করে সাহস জোগায়। লাভের টাকা এবং পারিবারিক সহায়তায় ধাপে ধাপে বাগানের পরিধি বাড়াতে থাকেন। বর্তমানে তাঁর বাগানে মিয়াজাকি, আম্রপালি, গৌড়মতি, হাড়িভাঙ্গা, বারি আম-১৬, কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউজাই, কিংসহ ১১ জাতের আম রয়েছে।

চাকরির পেছনে না ছুটে বাগান করে খালেকুজ্জামান যে সাফল্য এনেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর পথ অনুসরণ করে বদরগঞ্জ উপজেলার অনেকে এখন বাগান ও খামারের মালিক। যুবকদের জন্য খালেকুজ্জামানের এ কাজ অবশ্যই অনুকরণীয়।
সেলিনা আফরোজ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, বদরগঞ্জ

তবে খালেকুজ্জামান শুধু আম চাষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ৭০ শতক জমিতে মাছের চাষ করছেন আট বছর ধরে। খামারে রয়েছে পাঁচটি উন্নত জাতের গাভি ও ছাগল পালনও করছেন। সব মিলিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সমন্বিত কৃষি খামার। খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে তাঁর মাসিক গড় আয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। খামারে নিয়মিত কাজ করেন ১২ জন শ্রমিক। এই আয়ের টাকায় তিনি নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছেন, তিন একর জমি কিনেছেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থারও আমূল পরিবর্তন এনেছেন।
খালেকুজ্জামান বলেন, ‘আমের বাজার নিয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করি। মে মাসে বাজারে আম বেশি থাকায় দাম কম থাকে। তাই আমি এমন জাতের আম চাষ করছি, যেগুলো জুলাই-আগস্টে পাকে। মৌসুমের শেষ দিকে সরবরাহ কম থাকায় তখন ভালো দাম পাওয়া যায়। কৃষকদেরও লাভ বেশি হয়।’

নিজের সফলতার গল্পে তিনি থেমে থাকেননি। আশপাশের গ্রামের অনেককে আম চাষ, মাছের খামার এবং গাভি-ছাগল পালনে উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শে অনেকেই কৃষিকে লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

খালেকুজ্জামানের দেখানো পথে বদরগঞ্জের মোস্তফাপুর গ্রামের মতিন সরদার, মেহেদী হাসান, বাদশা মিয়া, ফারুক সরকার, প্রামাণিকপাড়া গ্রামের পরিতোষ চক্রবর্তী, এনামুল হক, সাইদুল ইসলাম, মফিজার রহমান, সাইফুল ইসলামসহ অনেকে আমের বাগান, গাভি, ছাগল ও মাছের খামার করে বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। মতিন সরদার বলেন, ‘খালেকুজ্জামানের উৎসাহে দুই একর জমিতে আমের বাগান করেছি। পাশাপাশি ৯টি গাভি ও পাঁচটি ছাগলের খামার গড়ে তুলেছি। এখন কৃষিই আমার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।’

প্রামাণিকপাড়া গ্রামের হোসেন আলী বলেন, ‘খালেকুজ্জামানের বাগান ও খামার দেখে পাঁচ বছর আগে আমের বাগান আর ছাগলের খামার করেছি। ইতিমধ্যে খামার লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৫টি ছাগল দিয়ে শুরু করা খামারে এখন ২৩টি ছাগল আছে। দুই একর জমিতে করা আমের বাগানে চার ধরনের বিদেশি আম আছে। ছাগল আর আম বিক্রি করে বছরের খরচ বাদে ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।’

তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার গ্রামের রনি মিয়া বাগান দেখতে এসে বলেন, ‘আমাদেরও আমবাগান আছে। এখানে এসে মিয়াজাকি, গৌড়মতি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো জাতের আম দেখে ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে এসব জাতের চারা সংগ্রহ করে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ বলেন, চাকরির পেছনে না ছুটে বাগান করে খালেকুজ্জামান যে সাফল্য এনেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর পথ অনুসরণ করে বদরগঞ্জ উপজেলার অনেকে এখন বাগান ও খামারের মালিক। যুবকদের জন্য খালেকুজ্জামানের এ কাজ অবশ্যই অনুকরণীয়।