দুই সন্তানের হামের চিকিৎসায় এক মাস হাসপাতালে, ইটভাটার শ্রমিক সাইফুল এখন নিঃস্ব
১৪ মাস বয়সের সানজিদা হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ দিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে কাতরাচ্ছে। কখনো মা, কখনো বাবা আবার কখনো চাচির কোলে তার দিন কাটছে। এর কিছুদিন আগে একই হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিল তার ৭ বছর বয়সী বড় ভাইও। বাবা সাইফুল ইসলাম কাজ করেন ইটভাটার শ্রমিক হিসেবে। দুই সন্তানের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ৩০ হাজার টাকার বেশি ধার করেছেন তিনি। হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে বলে কাজও নেই হাতে। এ অবস্থায় ওষুধ কেনার টাকা নেই তাঁর। দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
গত বুধবার নোয়াখালীর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। সাইফুল বলেন, ‘দুই বাইচ্চার পরপর হাম হইসে। এ কারণে এক মাসের বেশি সময় ধরি বলতে গেলে হাসপাতালেই থাইকতে অয়। টেয়া-হইসা আর কুলাইতাম হারিয়ের না। বেশির ভাগ ওষুধও কিনতে হয় বাইরে দোকানেত্তুন। এই লই হরায় ৩০-৪০ হাজার টেয়া খরচ কইচ্চি দুই বাইচ্চারলাই।’
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিটি কক্ষ ও কক্ষের বাইরে মেঝেতে পর্যন্ত হামের উপসর্গের রোগীদের রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলেও পরে নানা জটিল লক্ষণ দেখা দিচ্ছে ভর্তি হওয়া শিশুদের। অনেকের তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে। ফলে ওষুধসহ নানা ব্যয়বহুল চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সরকারি হাসপাতালে বিনা টাকায় রাতযাপন ছাড়া তেমন কোনো সেবা মিলছে না তাদের।
শিশু সানজিদার মতো হামের উপসর্গ নিয়ে নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছে শিশুরা। প্রতিদিনই হাসপাতালটিতে বাড়ছে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগ রোগীর পরিবার দরিদ্র হওয়ায় সরকারি হাসপাতালই তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখানে এসেও দামি সব ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরের দোকান থেকে। ওষুধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকেরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিটি কক্ষ ও কক্ষের বাইরে মেঝেতে পর্যন্ত হামের উপসর্গের রোগীদের রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলেও পরে নানা জটিল লক্ষণ দেখা দিচ্ছে ভর্তি হওয়া শিশুদের। অনেকের তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে। ফলে ওষুধসহ নানা ব্যয়বহুল চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। সরকারি হাসপাতালে বিনা টাকায় রাতযাপন ছাড়া তেমন কোনো সেবা মিলছে না তাদের।
চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের অভিভাবকদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ ইটভাটার, কেউ কৃষি, নির্মাণ কিংবা কেউ পরিবহনশ্রমিক। অভিভাবকেরা জানান, ব্যয় কমাতে সরকারি হাসপাতালে এলেও ওষুধের পেছনেই ব্যয় হচ্ছে সবটুকু। হাসপাতাল থেকে ওষুধ না পাওয়ায় বেশির ভাগ ওষুধই কিনতে হচ্ছে বাইরের দোকান থেকে।
হাসপাতাল থেকে চাহিদামতো ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ করেন ২০ মাস বয়সী শিশু রোহানের বাবা দেলোয়ার হোসেনও। সদর উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামে তাঁর বাড়ি। পেশায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলচালক এই অভিভাবক অভিযোগ করেন, তিন দিন আগে সন্তানকে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। এখনো অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। হাসপাতাল থেকে তেমন কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। নার্সরা ওষুধ লিখে দেন আর তাঁরা বাইরের ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে আনেন। সময়মতো তিনবেলা ইনজেকশনগুলো দিয়ে দেন নার্সরা। এ ছাড়া তেমন কোনো সেবা জোটে না তাঁদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে সরকারিভাবে শিশু ওয়ার্ডের জন্য অনুমোদিত শয্যা মাত্র ১৫টি। অথচ প্রতিদিন গড়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৯০, যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক গুণ বেশি। সংকট রয়েছে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের। ফলে হাসপাতালের বরাদ্দ ওষুধের বাইরেও সমাজকল্যাণ তহবিল থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তাতেও কোনোভাবে চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স আবদুল্লাহ ফারুক বলেন, শিশু ওয়ার্ডে রোগী অনুপাতে নার্স থাকার কথা কমপক্ষে ১০ জন। সেখানে সিনিয়র স্টাফ নার্স আছেন মাত্র দুজন। আর বাকিটা ইন্টার্ন চিকিৎসক ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। সেবার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ত্রুটি নেই। প্রত্যেকেই নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে যাচ্ছেন, যার ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বেশির ভাগ রোগীই এখান থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শিশু ওয়ার্ডের অনুমোদিত শয্যার সংখ্যা ১৫। অর্থাৎ ১৫ জন রোগীর জন্য ওষুধ, জনবলসহ অন্যান্য সরকারি বরাদ্দ থাকে। সেখানে গড়ে প্রতিদিনই ওই ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি থাকে ১৮০ থেকে ২০০ জন। এ বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালের সমাজকল্যাণ তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া হয়। তাও যেসব শিশুর অবস্থা বেশি খারাপ, তাদের চাহিদা অনুযায়ী পুরোপুরি ওষুধের জোগান দেওয়া সম্ভব হয় না।
মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে যাদের ডায়রিয়া থাকে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসায় খুব একটা সমস্যা হয় না। কিন্তু যেসব রোগীর শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়া থাকে, সেসব রোগীকে প্রতিদিন তিনটি ইনজেকশন দিতে হয়। একটি ইনজেকশনের দাম এক হাজার টাকা। সমাজসেবার রোগী কল্যাণ তহবিল থেকে দিনে একটি ইনজেকশন দেওয়া সম্ভব হয়। বাকি দুটি ইনজেকশন স্বজনদের বাইর থেকে কিনতে হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তত্ত্বাবধায়ক ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে নার্সের পদ আছে ১৯৪টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১৭০ জন। ছুটিসহ বিভিন্ন কারণে অনেকে দায়িত্বে থাকেন না। তিনি বলেন, হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হলেও এখানে প্রতিদিন গড়ে রোগী ভর্তি থাকেন ৬৫০ থেকে ৭০০ জন। এ কারণে নার্সের সংকট প্রকট। এ পরিস্থিতিতে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের সঙ্গে ইন্টার্ন নার্সদের দিয়ে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে দৈনন্দিন কাজ চালাতে হচ্ছে।