রাঙামাটি ও বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি, আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ছে মানুষ

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘর পরিষ্কার করছেন এক বাসিন্দা। আজ সকালে বান্দরবানের উজানী পাড়ায়ছবি: মং হাই সিং মারমা

রাঙামাটিতে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে এখনো পানিবন্দী রয়েছে জেলার এক হাজারের বেশি পরিবার। এদিকে বান্দরবান জেলায় বন্যার পানি নেমে গেছে। তবে এখনো জেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলা এবং চট্টগ্রামের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।

রাঙামাটি

​রাঙামাটিতে বন্যার পানি কমতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করেছেন মানুষ। তবে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্র অবস্থান করছেন। দুর্গত এলাকায় সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। এদিকে বন্যার পানি যত কমছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।

রাঙামাটির বরকল উপজেলার ​কুকিছড়া বাজারের বাসিন্দা সোনা রঞ্জন চাকমা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলার অনেক এলাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে কুকিছড়া বাজার এলাকার বাড়িঘর এখনো পানিতে ডুবে আছে। বাসিন্দাদের কেউ আশ্রয়শিবির, কেউ স্বজনদের ঘরবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এলাকায় ত্রাণ তেমন মিলছে না। যার কারণে বাসিন্দাদের খুবই দুর্ভোগে দিন কাটছে।

হাড়ভাঙা খাটুনি আর জমানো দেড় লাখ টাকা পুঁজি করে ৫০০টি পেঁপেগাছ লাগিয়েছিলাম। প্রতিটি গাছেই ফল এসেছিল, আর কয়েক দিন পর বাজারে তোলার কথা। এর আগেই বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেল। দিনরাত এই বাগানের জন্য খেটেছি।
ধর্মেশ চাকমা, পেঁপেচাষি, বরকল সদর ইউনিয়ন

একই উপজেলার ​ভূষণছড়া ইউনিয়নের ঠেগা খুব্বাং উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিতেন্দ্র চাকমা জানান, ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চুমচুমি, খুব্বাং, গামারীতলা, ঘুরেইয়েছড়া; ২ নম্বর ওয়ার্ডের চাদারাছড়া, ত্রিপুরাছড়া, থমবাগ, গুইছড়ি, চান্দবীঘাট এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুন্দরাছড়া, মরাঠেগাসহ বেশ কিছু গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি গতকাল রোববার কিছুটা কমলেও এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বন্যার পানিতে অনেকের খেতখামার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

ভূষণছড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জাঙেয়েছড়া গ্রামের বাসিন্দা জগৎময় চাকমা জানান, বন্যায় তাঁর দুই বিঘা পেঁপেবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১ লাখ ৪২ হাজার টাকা খরচ করে ৮৭২টি উন্নত জাতের পেঁপের চারা রোপণ করেছিলাম। গাছগুলো ফলবান হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বন্যার পানিতে পুরো বাগানই শেষ হয়ে গেল।’

বরকল সদর ইউনিয়নের বুরবুরিছড়ার বাসিন্দা ধর্মেশ চাকমা জানান, তিন বছর ধরে পেঁপে চাষ করে আসছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে পরিবারে কিছুটা সচ্ছলতা এসেছিল। কিন্তু এবারের বন্যায় তাঁর পেঁপেবাগান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধর্মেশ চাকমা বলেন, ‘হাড়ভাঙা খাটুনি আর জমানো দেড় লাখ টাকা পুঁজি করে ৫০০টি পেঁপেগাছ লাগিয়েছিলাম। প্রতিটি গাছেই ফল এসেছিল, আর কয়েক দিন পর বাজারে তোলার কথা। এর আগেই বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেল। দিনরাত এই বাগানের জন্য খেটেছি।’

বকলের ​বড় হরিণা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সতবাজি চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর এলাকায় বেশ কিছু গ্রাম এখনো ডুবে আছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই কোনো ত্রাণ পাননি।

বরকল উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, কেবল ভূষণছড়া ইউনিয়নেই ৪৪টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফসলি জমি, পেঁপে ও গ্রীষ্মকালীন সবজিখেত এবং আমনের বীজতলার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপকভাবে।

রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার অনেক এলাকা এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে ফারুয়া ইউনিয়নে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ওষুধেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

​রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানান, বর্তমানে জেলার ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন মানুষ অবস্থান করছেন। এখনো ১ হাজার ৪৪টি পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। জেলায় অতিবৃষ্টির কারণে ৭টি উপজেলার মোট ১৩১টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানান তিনি।

বান্দরবান

বান্দরবানে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন বাসিন্দারা। আজ সোমবার সকালে বালাঘাটা, আর্মিপাড়া, উজানীপাড়া, ইসলামপুরসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তাঘাট কাদায় পরিপূর্ণ। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন লোকজন।

উজানীপাড়ার বরিশাল বস্তিতে কথা হয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ঘরজুড়ে কাদা। এসব পরিষ্কার করতে তিনি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে এসেছেন। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঘরে ফিরতে আরও সময় লাগবে তাঁর।

আট দিন ধরে বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন হনুফা বেগম। তিনি বলেন, বন্যার পানি সরলেও এখনো শঙ্কা কাটেনি। সাঙ্গু নদের পানি উপচে যেকোনো সময় বাড়িতে ঢুকতে পারে। তাই পরিস্থিতি বুঝে আগামীকাল মঙ্গলবার আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম জানান, উপজেলার বিভিন্ন সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে। তবে পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটির কারণে যান চলাচল স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হবে, এমনটি আশা করছেন তিনি। তবে শীলক খালের ভেসে যাওয়া বেইলি সেতু নতুন করে না হলে বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা-রাঙামাটি সড়কে বাস চলাচল সম্ভব নয়।

বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসান বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ চলছে। এ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে সাড়ে তিন হাজার মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ত্রাণ দিচ্ছে। এখন জীবনযাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে।