উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা
ভালো ফলে বদলে যাচ্ছে পুরোনো হিসাব
এইচএসসিতে ভালো ফল বিবেচনায় নিলে সরকারি কলেজের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি কলেজ।
এক দশক আগেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বললে শুধু সরকারি কলেজগুলোকে নিয়ে আলোচনায় হতো। সেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলেছে। এইচএসসিতে ভালো ফল বিবেচনায় নিলে সরকারি কলেজের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি কলেজ। মানসম্পন্ন শিক্ষা, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্নশীল হওয়ায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে এইচএসসিতে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারি কলেজ ছিল তিনটি। এর মধ্যে জেলা শহরে দুটি—ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজ। এ বাইরে উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে নবীনগর সরকারি কলেজ। ২০১৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আখাউড়া শহিদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজ, নাসিরনগর (ডিগ্রি) মহাবিদ্যালয়, বাঞ্ছারামপুর ডিগ্রি কলেজ, সরাইল ডিগ্রি কলেজ, আশুগঞ্জ ফিরোজ মিয়া কলেজ এবং কসবা আদর্শ মহাবিদ্যালয়।
গত পাঁচ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরকারি কলেজগুলোর তুলনায় বেসরকারি কলেজগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করছে। এর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজ ও আখাউড়ার ক্যামব্রিয়ান কলেজ।
ইউনাইটেড কলেজ ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় এইচএসসির ফলাফলে পাসের হারে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই কলেজ পাসের হারে ছিল দ্বিতীয়। অন্যদিকে পাসের হারে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেলার আখাউড়া উপজেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে আখাউড়া ক্যামব্রিয়ান কলেজ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সানিয়া বেগম বলেন, ‘অনেকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, বেসরকারি কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের প্রতি বেশি যত্নশীল। এইচএসসিতে ভর্তির ক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় বেসরকারি কলেজের নাম রেখেছি।’
সরকারি কলেজে ভর্তি হতে না পারলে বেসরকারি কলেজে ভর্তি হবেন বলে জানিয়েছেন অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী রিফাত ইসলাম।
দুই সরকারি কলেজের চিত্র
জেলার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকেরা বলেছেন, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হন।
২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের ১ হাজার ১১৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৯৯৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৮৫ জন। আর ২০২৪ সালে ১ হাজার ৬৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৯৮৬ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩১৯ জন।
অপর দিকে ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের ৭৯৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫৯০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭ জন। ২০২৪ সালে ৭১৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫৯৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬০ জন।
সরকারি দুটি কলেজের দুজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি কলেজে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সরকারি কলেজেই ভর্তি হয়। তবে বেসরকারি কয়েকটি কলেজ এখন ভালো করছে।
বেসরকারি কলেজের সাফল্য
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় এই কলেজ থেকে অংশ নেওয়া ৪৪৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিলেন ৩১৫ জন। পাসের হার ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১৮ জন। ২০২২ সালে ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিলেন ৩১৫ জন। পাসের হার ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৩৫ জন। ২০২৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় ২৬১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিলেন ২৩৩ জন। পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১২ জন। ২০২৪ সালে ৩৬৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিলেন ৩১৮ জন। পাসের হার ছিল ৮৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১৪ জন। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৭৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিলেন ৩০৪ জন। পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ২১ শতাংশ। জিপিএ–৫ পেয়েছিল ৫ জন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষ ইবনে আঈন মারুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কলেজ থেকে ৮০-৯০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এই কলেজ থেকে ভালো ফল করা প্রায় ৩০-৪০ শিক্ষার্থী এখন বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। সহশিক্ষা কার্যক্রমেও আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো করছে।’
আখাউড়া ক্যামব্রিয়ান কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে এই কলেজের যাত্রা শুরু। ২০২১ সাল থেকে শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। প্রথম বছরেই এইচএসসি পরীক্ষায় ১০০ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে শতভাগ পাস করেছিলেন। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬১ জন। ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৬ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছিলেন। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৫১ জন। ২০২৩ সালে ১০৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে সবাই পাস করেছিলেন। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ২০ জন। ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ১৬৬ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে শতভাগ পাস করেছিল। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৭৬ জন। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৮৩ জন। জিপিএ–৫ পেয়েছেন ৬ জন।
আখাউড়া ক্যামব্রিয়ান কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক হাজারী প্রথম আলোকে বলেন, আগামী বছর কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকতে চান তাঁরা।