পাবনায় প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, সালিসে ‘জুতার ২০ বাড়ি’ দিয়ে মীমাংসার চেষ্টা

ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় গ্রাম্য সালিসে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জুতা দিয়ে ২০টি বাড়ি দিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায়ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

পাবনার সাঁথিয়ায় বুদ্ধি ও বাক্প্রতিবন্ধী নারীকে (৩০) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ গ্রাম্য সালিসে ‘জুতার ২০টি বাড়ি’ দিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে হওয়া সেই সালিসের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

সমালোচনার মুখে প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। এরপর ভুক্তভোগী নারীর ভাই আজ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে অভিযুক্ত মহব্বত আলী খাঁয়ের (৪৫) বিরুদ্ধে সাঁথিয়া থানায় মামলা করেন।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আসামি পলাতক। তাঁকে ধরার চেষ্টা চলছে।

এ ধরনের অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিসে নিষ্পত্তির সুযোগ নেই বলে জানান সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ৬ জুলাই ঘটনার দিন ওই নারী বাড়িতে একা ছিলেন। দুপুরে তাঁর মা পাশের বাড়িতে গেলে সেই সুযোগে মহব্বত ঘরে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় ওই নারীর গোঙানির শব্দ শুনে মা ও প্রতিবেশীরা ছুটে এলে অভিযুক্ত পালিয়ে যান।

ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। থানায় না গিয়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক সদস্যের বাড়ির উঠানে একটি সালিস বৈঠক বসে। সালিসে ইউপি চেয়ারম্যান, তিনজন ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় কয়েকজন মাতব্বর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ স্বীকার করলে তাঁকে ২০টি জুতার বাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

আমরা গরিব মানুষ। সালিসে যে সিদ্ধান্ত হইছে, তা আমাগরে মনমতো হয় নাই। তাই আমরা সেখান থ্যা চইল্যা আসি। আমরা কারও বিরুদ্ধে কিছু কোব্যার চাই না। শুধু চাই, বিষয়টির আইন অনুযায়ী সঠিক বিচার হোক।
ভুক্তভোগী নারীর ভাই ও মামলার বাদী

তবে এ ধরনের অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিসে নিষ্পত্তির সুযোগ নেই বলে জানান সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না। আজ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। কেন এমন সালিস করা হয়েছে, সে বিষয়ে চেয়ারম্যানকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে সালিসে দুজন ব্যক্তি অভিযুক্ত মহব্বত আলীকে পালাক্রমে ২০টি জুতার বাড়ি মারছেন। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সালিসে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে একজন ইউপি সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আইনের বিষয়টি জানতাম না। চেয়ারম্যানের ডাকে সেখানে গিয়েছিলাম।’ আর চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘অভিযুক্ত অপরাধ স্বীকার করেছেন। এ ধরনের ঘটনার বিচার সালিসে করার সুযোগ নেই, সেটি আমি জানি। তবে দুই পক্ষ সমাধান চেয়েছিল বলেই সালিস হয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অসহায় একটি পরিবারের ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা এই সালিসে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগী নারীর ভাই ও মামলার বাদী আজ বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। সালিসে যে সিদ্ধান্ত হইছে, তা আমাগরে মনমতো হয় নাই। তাই আমরা সেখান থ্যা চইল্যা আসি। আমরা কারও বিরুদ্ধে কিছু কোব্যার চাই না। শুধু চাই, বিষয়টির আইন অনুযায়ী সঠিক বিচার হোক।’