উষা রঞ্জনের রসগোল্লা, কেজি দরে নয়, বিক্রি হয় পিস হিসেবে

চকরিয়ার হারবাং বাজারের ৮২ বছর বয়সী উষা রঞ্জন পাল পাঁচ দশক ধরে ঐতিহ্যবাহী রসগোল্লা তৈরি করছেন। তাঁর ‘পাল মিষ্টি ভান্ডারে’ রসগোল্লা কেজিতে নয়, পিস হিসেবে বিক্রি হয়। কাঠের চুলায় তৈরি এই মিষ্টির স্বাদ ধরে রাখতে এখনো পুরোনো পদ্ধতিই অনুসরণ করেন তিনি।

গামলা ভর্তি গরম রসগোল্লা তৈরি হয়েছে পাল মিষ্টি ভান্ডারে। কক্সবাজারের চকরিয়ার হারবাং বাজারেছবি: প্রথম আলো

পুরোনো টিনশেডের দোকান। বাতাসে টিনের চাল কেঁপে ওঠে। ভেতরে কয়েকটি নড়বড়ে কাঠের টেবিল-চেয়ার। একপাশে কড়া পাকে জাল দেওয়া গরম রসগোল্লা। সেখান থেকে প্লেটে করে চলে যাচ্ছে টেবিলে টেবিলে। চারদিকে ছড়িয়ে ঘন দুধ, মালাই আর এলাচের মৃদু ঘ্রাণ।

এলাকায় পরিচিত পালের মিষ্টি হিসেবে। পালের মিষ্টি অর্থাৎ রসগোল্লা এক, দুটি খেলে পোষায় না। একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি নিয়ে বসতে হবে। সঙ্গে মুচমুচে নিমকি। আর এই মিষ্টি খেতে যেতে হবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং বাজারে। হারবাং বাসস্টেশন থেকে পশ্চিমে এক কিলোমিটার গেলেই হারবাং বাজার। বাজারের পুরোনো দোকানগুলোর মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে ‘পাল মিষ্টি ভান্ডার’।

পাল মিষ্টি ভান্ডারে কেবল রসগোল্লা আর নিমকিই বিক্রি হয়। রসগোল্লা কেজিতে বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় প্রতি পিস ১২ টাকা দামে। পাঁচ দশক ধরেই এই ঐতিহ্যই টিকে আছে। তবে যে হিসেবেই বিক্রি হোক, এখানে লাইন দিয়ে রসগোল্লা কিনতে আসে আসেন ক্রেতারা। দেরি করে এলে পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

পাল মিষ্টি ভান্ডারের মালিক উষা রঞ্জন পালের (৮২) চুল সাদা হয়েছে বহু আগে। মুখে পড়েছে বয়সের রেখা। কিন্তু এখনো নিজ হাতেই রসগোল্লা বানান তিনি। সে সময় তাঁর হাত একটুও কাঁপে না। দুধের ঘনত্ব, ছানার পাক কিংবা রসের জ্বাল—সবকিছু তিনি এখনো নিজে পরখ করে দেখেন।

গতকাল সোমবার সেখানে গেলে দেখা যায়, এক কক্ষের দোকান ঘরের সামনের অংশে রসগোল্লা বেচাকেনা চলছে। আর ভেতরের কারখানায় চুলার পাশে বসা উষা রঞ্জন পাল। এক কোণে বড় টিনের ড্রামে সাজানো মুচমুচে নিমকি। টিনের বড় গামলায় ছোট ছোট রসগোল্লা। বাহারি সাজ নেই, রঙের চাকচিক্য নেই। শুরুতে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। শুরুর দিনগুলোর মতো এখনো মাটির চুলায় কাঠের আগুনে রসগোল্লা তৈরি হয়। চুলার পাশে বসেই নিজের জীবনের গল্প বলেন উষা রঞ্জন পাল।

পাল মিষ্টি ভান্ডারে কেবল রসগোল্লা আর নিমকিই বিক্রি হয়। রসগোল্লা কেজিতে বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় প্রতি পিস ১২ টাকা দামে। পাঁচ দশক ধরেই এই ঐতিহ্যই টিকে আছে। তবে যে হিসেবেই বিক্রি হোক, এখানে লাইন দিয়ে রসগোল্লা কিনতে আসে আসেন ক্রেতারা। দেরি করে এলে পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

গল্পের শুরুটা সুখের নয়

খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারান উষা রঞ্জন পাল। সংসারের অভাব তখন ঘিরে ধরে পুরো পরিবারকে। বই-খাতার বদলে হাতে তুলে নিতে হয় কাজ। ১৯৫৮ সালে বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। সে বয়সেই হারবাং বাজারের রেবতী দত্তের ঐতিহ্যবাহী ‘দত্ত মিষ্টি ভান্ডারে’ কাজ নেন তিনি। ‘সংসার চালানোর জন্যই কাজে নামতে হয়েছিল’, বলেন উষা রঞ্জন পাল। কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর চোখ চলে যায় চুলার আগুনের দিকে। বললেন, প্রথম দিকে তিনি রসগোল্লা বানানো দেখতেন। তারপর ধীরে ধীরে শিখতে শুরু করেন। কীভাবে দুধ জ্বাল দিতে হয়, কখন ছানা কাটতে হয়, কতক্ষণ মাখতে হয়, কতটা আগুনে রস ফুটবে—প্রতিটি বিষয় শেখেন হাতে-কলমে। পরে সেই দোকানই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের বিদ্যালয়।

মিষ্টির দোকানের মালিক উষা রঞ্জন পাল নিজের হাতেই বানান এই রসগোল্লা। কক্সবাজারের চকরিয়ার হারবাং বাজারে
ছবি: প্রথম আলো

হয়ে ওঠেন দক্ষ কারিগর

সময়টা ১৯৭২ সাল। মাত্র দেশ স্বাধীন হলো। রেবতী দত্ত সিদ্ধান্ত নেন দোকানটি বিক্রি করে দেবেন। অনেকের চোখে সেটি ছিল একটি ব্যবসা। কিন্তু উষা রঞ্জন পালের কাছে সেটি ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। নিজের সঞ্চয় আর সাহসকে পুঁজি করে দোকানটি কিনে নেন তিনি। নতুন নাম দেন—‘পাল মিষ্টি ভান্ডার’।

উষা রঞ্জন পাল হেসে বলেন, ‘তখন মানুষ এক আনায় রসগোল্লা কিনে খুশি হতো। এখন একটি মিষ্টি ১২ টাকা। সময় বদলেছে, দাম বদলেছে, কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি স্বাদটা যেন না বদলায়।’ তিনি মনে করেন, স্বাদের এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে আলাদা করেছে।

চকরিয়া, পেকুয়া, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, লামা—আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মানুষ তাঁর দোকানে আসেন। কেউ আত্মীয়ের বাড়ি যাবেন, কেউ মেয়ের শ্বশুরবাড়ি, কেউ দূর শহরে ফিরছেন—হাতে একটি বাক্স পালের মিষ্টি থাকবেই। অনেকেই বলেন, এই মিষ্টি শুধু খাবার নয়, এটি ভালোবাসা নিয়ে যাওয়ারও একটি মাধ্যম।

বয়সে তরুণ, যাঁদের একটি মোটরসাইকেল আছে—তাঁরা এই দোকানে বিকেলের ক্রেতা। লোহাগাড়া, চকরিয়া, লামা ও পেকুয়া এ চার উপজেলার বেশির ভাগ তরুণ বিকেলে পাল মিষ্টি ভান্ডারে ঢুঁ মারবেনই। পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি করেন রাশেদুল কবির। তিনি নিয়মিত পাল মিষ্টি ভান্ডারের গ্রাহক। রাশেদুল কবির জানান, মাসে ৪-৫ বার পাল মিষ্টি খেতে আসি। আবার বাড়ির জন্যও নিয়ে যাই। স্বাদে আর গুণে অনন্য এ মিষ্টি।

ছানা, চিনি, এলাচ আর অল্প ময়দা—এই চার উপাদানেই উষা পালের রসগোল্লা তৈরি হয়। এক কেজি ছানার সঙ্গে মাত্র ২০ গ্রাম ময়দা মেশান তিনি। এর বেশি ময়দা দিলে মিষ্টির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায় বলে তাঁর বিশ্বাস।

দুধের ছানা কাটা হয় লেবুর রস দিয়ে। তারপর সেই ছানা মাটির চুলায় কাঠের আগুনে ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয়। আধুনিক যন্ত্রের যুগেও তিনি এখনো পুরোনো পদ্ধতি ছাড়েননি। উষা রঞ্জন বলেন, কাঠের আগুনের একটা আলাদা জ্বাল আছে। এতে মিষ্টির স্বাদও আলাদা হয়।

১৯৫৮ সালে বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। সে বয়সেই হারবাং বাজারের রেবতী দত্তের ঐতিহ্যবাহী ‘দত্ত মিষ্টি ভান্ডারে’ কাজ নেন উষা রঞ্জন পাল। সেখানে প্রথম দিকে তিনি রসগোল্লা বানানো দেখতেন। তারপর ধীরে ধীরে শিখতে শুরু করেন। কীভাবে দুধ জ্বাল দিতে হয়, কখন ছানা কাটতে হয়, কতক্ষণ মাখতে হয়, কতটা আগুনে রস ফুটবে—প্রতিটি বিষয় শেখেন হাতে-কলমে। পরে সেই দোকানই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের বিদ্যালয়।

৪০ কেজি দুধ থেকে তৈরি হয় মাত্র ৩০০টি মিষ্টি। সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকেই তিনি সব সময় বেশি গুরুত্ব দেন। দুধ পাওয়া সাপেক্ষে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি মিষ্টি তৈরি হয়। তবে বিয়ে, মিলাদ কিংবা বড় অনুষ্ঠানের অর্ডার থাকলে উৎপাদন আরও বাড়ে। দৈনিক কত টাকা আয় করেন এমন প্রশ্নে বেশ বিরক্তি দেখা গেল তাঁর চোখে মুখে। তিনি বলেন, ‘৫০ বছরের ব্যবসা। কত উত্থান-পতন ঘটেছে। ব্যবসা ছেড়ে যাইনি। এখানে ভালোবাসা আমার কাছে মুখ্য। আয় যা হয় তা দিয়েই সংসার চলে।’

দোকানে এখন তিনি ছাড়া আরও তিন কর্মচারী কাজ করেন। কিন্তু দিনের একটা সময় উষা রঞ্জন পাল দোকানে বসবেনই। দোকানে না গেলে দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে উষা রঞ্জনের। তিনি কখনো ক্রেতার সঙ্গে কথা বলেন, কখনো কড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছানা দেখেন, আবার কখনো নতুন তৈরি হওয়া মিষ্টির রং দেখে বুঝে নেন জ্বাল ঠিক হয়েছে কি না।

তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে দুই ছেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মেয়ে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সন্তানরা নিজ নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেও উষা রঞ্জন পাল এখনো দোকান ছেড়ে বাড়িতে বসে থাকতে শেখেননি। কারণ, এই দোকান তাঁর কাছে কেবল জীবিকার জায়গা নয়; এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।