একসঙ্গে চারজনের জানাজা ও দাফন আগে কখনো দেখেননি ভাইগর গ্রামবাসী

কুমিল্লার দাউদকান্দিতে সড়ক দুর্ঘটনায় দিনাজপুরের বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার সাতজন নিহত হন। আজ বুধবার সকালে বিরামপুরের ভাইগর গ্রামের একটি মাদ্রাসা মাঠে চারজনের একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়ছবি: প্রথম আলো

গ্রামের মাঝখানে মাদ্রাসার মাঠে হাজারো মানুষের সমাগম। মাঠের পশ্চিম পাশে চারটি খাটিয়াতে সাদা কাফনে মোড়ানো লাশ। লাশের পাশে দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনকে ধরে কাঁদছেন। একসঙ্গে চারজনের জানাজা এর আগে কখনো হয়নি এ গ্রামে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, গ্রামবাসী আর দূরদূরান্ত থেকে আসা সবার দৃষ্টি চারটি খাটিয়ার দিকে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হচ্ছে গ্রামের বাতাস।

আজ বুধবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ভাইগর গ্রামে। গত সোমবার দিবাগত রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দির হাসানপুরে চালবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে। এতে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে সাতজন নিহত ও ছয়জন গুরুতর আহত হন। নিহত চারজনের বাড়ি বিরামপুর উপজেলার ভাইগর গ্রামে।

আজ সকালে ভাইগর তালিমুল কোরআন একাডেমি মাঠে নিহত চারজনের জানাজা সম্পন্ন হয়। স্থানীয় হাফেজ রিয়াজুল ইসলাম তাঁদের জানাজার নামাজ পড়ান।

আরও পড়ুন

নিহত চারজন হলেন, ভাইগর গ্রামের আবু হোসেন (৪২), বিষু মিয়া (৪৫), সুমন বাবু (২২) ও আবদুর রশিদ (৬৫)। নিহত সবাই তাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।

দুর্ঘটনায় নিহত অপর তিনজন হলেন, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিপপুর গ্রামের আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০) ও আবু সালেক (৪৫)। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খালিপপুর গ্রামের ডাঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ওই তিনজনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়।

নিহত ব্যক্তিদের সবাই ধানকাটা শ্রমিক। তাঁরা খরচ কমাতে ট্রাকে করে কাজের সন্ধানে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

ভাইগর গ্রামে একসঙ্গে চারজনের জানাজা ও দাফন হবে এমন খবর পেয়ে বিরামপুর ও আশপাশের উপজেলা থেকে নিহত ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সাধারণ মানুষ ছুটে আসেন ভাইগর গ্রামে।

আরও পড়ুন

কবরস্থানে নিহত আবু হোসেন ও সুমন বাবুর কবর খুঁড়ছিলেন ওই গ্রামের বাসিন্দা বাদল হোসেন (৪৭)। তিনি বলেন, বারো-চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই গ্রামে বাবা-দাদাদের সঙ্গে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন। তিনি জীবনে কখনোই একসঙ্গে দুটি বা চারটি কবর খোঁড়েননি। আজকে একটি মর্মান্তিক ঘটনায় তিনি একসঙ্গে দুটি কবর খুঁড়লেন। গ্রামে চারটি খবর খোঁড়া হলো, এটি খুবই বেদনাদায়ক।

ছেলে আবু হোসেনকে হারিয়ে বাড়ির বারান্দায় বসে কাঁদছেন মা শিরিন সুলতানা। তিনি বলেন, আবু হোসেনকে তার বাবা কাজের জন্য কুমিল্লায় যেতে নিষেধ করেছিলেন। তবু সে জোর করে গিয়েছে। আবু হোসেনের ছেলেরাও তাকে যেতে মানা করেছিল।

কুমিল্লায় যাওয়ার দিন ছেলেকে তার পছন্দের খাবার কাঁঠালের কান্দা (দানা) রান্না করে খাওয়ান। ছেলে যাওয়ার পর রাত থেকে ছেলের জন্য মন পুড়ছিল মা শিরিন সুলতানার। পরদিন ভোরে মুঠোফোনে তাঁর ছেলের মৃত্যুর খবর পান তিনি।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আবু হোসেনের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন করা হয়েছে সবার নিরাপত্তার জন্য। এই নিরাপত্তা যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সরকার যেন এটি নিশ্চিত করে।

স্থানীয় কৃষিশ্রমিকেরা জানান, প্রতিবছর এপ্রিল মাসে ভাইগরসহ আশপাশের গ্রামে তেমন কোনো কাজ থাকে না। এ জন্য গ্রামের কৃষিশ্রমিকেরা পেঁয়াজ তোলার কাজ করতে ফরিদপুর ও ধান কাটার কাজ করতে কুমিল্লায় যান। সেখানে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। এতে দুই সপ্তাহ কাজ করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বাড়তি আয় করে তাঁরা বাড়ি ফেরেন। প্রতিবছর এ মৌসুমে ভাইগর ও আশপাশের গ্রাম থেকে প্রায় আড়াই শ কৃষিশ্রমিক বিভিন্ন জেলায় গিয়ে দিনমজুরির কাজ করেন।

বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কমল কৃষ্ণ রায় বলেন, প্রতিবছর এপ্রিল মাসে বিরামপুর উপজেলার দুই-তিনটি ইউনিয়নের ফসলি মাঠে তুলনামূলক কাজ কম থাকে। এ জন্য সংসারের খরচ মেটাতে জীবিকার তাগিদে এ উপজেলার প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কৃষিশ্রমিক বিভিন্ন জেলায় পেঁয়াজ তোলা ও আগাম ধান কাটার কাজ করতে যান।