‘বাপে তো মায়া করছে, পুতে তো মায়া করছে না’

ছেলের লাঠির আঘাতে নিহত বাবা আবদুস সামাদছবি: পরিবারের সৌজন্যে

‘বাপে তো লাডি (লাঠি) লইয়া ভয় দেখাইছে, বাড়ি দিছে না। বাপে তো মায়া করছে, পুতে তো মায়া করছে না। পুতে তো বাঁশ দিয়ে বাড়ি মাইরা দিছে। এক বাড়িতে মাটিত পইড়া গেছেগা। পইড়া গিয়া আর কোনো শব্দ নাই। এর পরেও বাইড়াইছে।...এমুন দৃশ্য আর জীবনে দেখছি না।’

আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে কথাগুলো বলেন মাদকাসক্ত ছেলের হাতে নিহত আবদুস সামাদের প্রতিবেশী জুবেদা খাতুন। এই প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, ছেলের আক্রমণ থেকে বাঁচতে আবদুস সামাদ পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও বাঁচতে পারেননি।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার সাইটালিয়া গ্রামের বন্নাভিটা এলাকায় গতকাল রোববার দিবাগত রাত তিনটার দিকে একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেনের (৩৫) লাঠির আঘাতে বাবা আবদুস সামাদ (৬০) নিহত হন। ঘটনার পর থেকে ছেলে পলাতক।

স্বজনেরা জানান, আবদুস সামাদ দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। বিদেশ থেকে ফিরে পিকআপ কিনে নিজেই সেটি চালাতেন। তাঁর একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেনের তিন সন্তান রয়েছে। কিন্তু আনোয়ার কাজকর্ম না করায় তাঁর সন্তানদের লালনপালনের দায়িত্বও পালন করতেন দাদা আবদুস সামাদ।

সাইটালিয়া-সুটিপাড়া এলাকায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক ছড়িয়ে গেছে। পুলিশ মাদকসহ লোকজন ধরে নিয়ে যায়। এক-দেড় ঘণ্টা পর দেখি, আসামি আবার নিজের বাড়িতে হাজির। কীভাবে তারা ছাড়া পায়, কীভাবে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পায়, তা আল্লাহ আর প্রশাসনই জানে।
— মো. সোহাগ খান, স্থানীয় বাসিন্দা, সাইটালিয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

স্বজনদের অভিযোগ, তিন বছর আগে আনোয়ারের মারধরে তাঁর মায়ের হাত ভেঙে গিয়েছিল। সম্প্রতি মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলেন আনোয়ার। নেশা ছাড়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ায় বাবার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তিনি।

‘মাদকের কারণে আমার পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গেছে’

অভিযুক্ত আনোয়ারের স্ত্রী শারমিন আক্তার স্বামীর নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, মেয়ের জন্মের পর থেকেই স্বামীর মাদক গ্রহণের বিষয়টি বুঝতে পারেন। নেশা করে গভীর রাতেও ঘুমাতেন না, তাঁকে মারধর করতেন। তাঁকে রক্ষা করতে গেলে শ্বশুরকেও মারধর করতেন।

গত রোববার দিবাগত রাত তিনটার সময়ের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শারমিন বলেন, ‘আমারে যে মারতাছে, অশ্লীল গালিগালাজ করতাছে—এগুলা সব তাঁর বাপে শুনছে। শুইন্না পরে যখন বাইরে গেছে লোকজনরে ফোন কইরা আনবার জন্য, তখন আমি ভয়ে বলতেছি, না আব্বা, আমারে কিছু করে নাই, আপনি কাউরে ডাক দিয়েন না। এত রাইতে মানুষ ঢাহায়া আনলে সমস্যা হইব। আমি আব্বারে ফিরাইয়া রাখতারছি না, আব্বা গেছে। এরপরে আমার স্বামী আব্বারে মাইরা শেষ করে দিছে। মাদকের কারণে আমাদের পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গেছে।’

‘ঘরে ঘরে এমন আনোয়ারের জন্ম হবে’

এই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকার অন্য বাসিন্দারাও উদ্বিগ্ন। তাঁদের অভিযোগ, এলাকায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে নানা সমস্যায় পড়লেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না তাঁরা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত অনেকে।

আজ মঙ্গলবার সরেজমিন ওই গ্রামে গিয়ে কথা হয় নিহত আবদুস সামাদের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। সাইটালিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. মনির হোসেন বলেন, ‘মাদকের এই পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে শ্রীপুরের ঘরে ঘরে এমন আনোয়ারের জন্ম হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোহাগ খানের অভিযোগ, সাইটালিয়া ও সুটিপাড়া এলাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাদকসহ কাউকে আটক করার পরও তাঁদের আবার এলাকায় ফিরে আসতে দেখা যায় বলেও দাবি করেন তিনি।

সোহাগ খান বলেন, ‘সাইটালিয়া-সুটিপাড়া এলাকায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক ছড়িয়ে গেছে। পুলিশ মাদকসহ লোকজন ধরে নিয়ে যায়। এক-দেড় ঘণ্টা পর দেখি, আসামি আবার নিজের বাড়িতে হাজির। কীভাবে তারা ছাড়া পায়, কীভাবে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পায়, তা আল্লাহ আর প্রশাসনই জানে।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যবস্থা নেয়। মাদকসহ আসামি ধরে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা আমার সময়ে ঘটেনি। এগুলো ঢালাও অভিযোগ করা হচ্ছে।’