বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকা জোগাতে শ্রমিকের কাজ করছেন ওমর

ওমর ওসমান। মঙ্গলবার সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মহিষাখোলা গ্রামেছবি: প্রথম আলো

‘স্বামীর কিডনি নষ্ট হয়া ১৪ বছর আগেই মারা গেছে। ইনকামের লোক নাই। ছেলে পড়াশোনা করতি চায়, কিন্তু আমি পারতিছিনে। এই ঘরটুক মানুষ সাহায্য করে তুলে দিছে। এহন ছেলে চাচ্ছে পড়াশোনা করতি। আমি মানা করছি, সে শোনতেছে না। আমি টাকা পাব কোনে?’

ছলছল চোখে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাসিন্দা ফাতেমা খাতুন। তিনি উপজেলার সদকী ইউনিয়নের মহিষাখোলা গ্রামের মৃত খবির উদ্দিনের স্ত্রী। সংসারে তাঁর দুই ছেলে। ওমর ওসমান ও রাফিউল। ওমর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, ওমর দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তাঁর বাবা কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর পর থেকে তাঁর মা অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন। ওমর উপজেলার জিডি শামছুদ্দিন আহমেদ কলেজিয়েট স্কুল থেকে ২০২৩ সালে বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৯২ পয়েন্ট পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কুষ্টিয়ার একটি কোচিং সেন্টারে এক শিক্ষকের সহযোগিতায় বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন।

আজ মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মহিষাখোলা গ্রামের একটি মেঠোপথের ধারে ওমরদের টিনশেড বাড়ি। ভেতরে দুটি ঘর। বাড়িতে ভাঙা কাঠের দরজা থাকলেও জানালায় রয়েছে কয়েক টুকরা কাঠ ও ছেঁড়া কাপড়। বাড়ির পাশের একটি মাঠে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে পেঁয়াজ তুলছিলেন ওমর।

অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলছেন ওমর ওসমান। মঙ্গলবার সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মহিষাখোলা গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

সেখানে গিয়ে কথা হয় ওমরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্কুল, কলেজ ও কোচিংয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতায় আজ পর্যন্ত আমার লেখাপড়া হয়েছে। আমার পরিবারের সামর্থ্য নাই যে আমাকে একটা বই বা খাতা কিনে দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির গুচ্ছ পরীক্ষায় সারা দেশের মধ্যে ৯০তম স্থান অর্জন করেছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫১তম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪৩তম স্থান পেয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু টাকার অভাবে ভর্তি ও পড়াশোনা অনিশ্চিত। আপাতত ভর্তির টাকার জন্য আজকে থেকে মাঠে কাজ করছি ৫০০ টাকা মজুরিতে।’

ওমরের বন্ধু ইমরান হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই, ওমরের পড়াশোনা যেন টাকার অভাবে বন্ধ না হয়।’

জিডি শামছুদ্দিন আহমেদ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধানশিক্ষক সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওমর ভালো ছেলে। বিনা খরচে আমার প্রতিষ্ঠান থেকে সুনামের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। তাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি।’