শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে ১০ নারী–পুরুষ–শিশু, দুই দফা পতাকা বৈঠকেও সমাধান আসেনি

পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া গ্রামের সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে বিএসএফ। এতে বাধা দিয়েছে বিজিবি। ফলে ওই ব্যক্তিদের শূন্যরেখায় বসিয়ে রাখা হয়েছেছবি: রাজিউর রহমান

পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) যে ১০ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে, তাঁরা এখনো শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। গতকাল শুক্রবার ভোর পাঁচটা থেকে আজ শনিবার বেলা তিনটা পর্যন্ত কোনো দেশই তাঁদের সীমান্তে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তাঁরা খোলা আকাশের নিচে ফসলি জমির আলে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এ সময় দুই পাশে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) ও বিএসএফ সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

শূন্যরেখায় অবস্থান করা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুজন নারী ও তিনজন শিশু। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাতে বজ্রবৃষ্টির সময়ও তাঁরা সেখানে ছিলেন। শূন্যরেখায় ফসলি জমির যে আলটিতে তাঁরা বসে আছেন, সেখানেও পানি জমেছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী দুই দফা পতাকা বৈঠকে বসলেও কোনো সমাধান আসেনি।

আরও পড়ুন

আজ শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে বাংলাদেশের নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যটালিয়ন এবং ভারতের ৯৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মধ্যে কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় আধা ঘণ্টার ওই পতাকা বৈঠকেও কোনো সুরাহা হয়নি। এর আগে গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিজিবির বড়বাড়ি বিওপি এবং বিএসএফের সাকাতি ক্যাম্পের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

দুপুরের সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি গিয়ে দেখা যায়, পানি জমে থাকা ফসলি জমির আলে পুশ ইন–চেষ্টার শিকার নারী, শিশুসহ ১০ জনের কেউ দাঁড়িয়ে আবার কেউ কেউ বসে আছেন। এ সময় তাঁদের মধ্যে থাকা আবদুস সালাম নামের এক যুবক উত্তেজিত হয়ে বলছিলেন, ‘আমরা কী চোর না ডাকাত যে আমাদের এভাবে কষ্ট দিচ্ছেন। ভারতে গিয়ে যদি আমরা অপরাধ করে থাকি, তাহলে আমাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হোক। কিন্তু এভাবে না খাইয়ে পানির মধ্যে কেন কষ্ট করে রাখা হবে। আমরা কি মানুষ না?’

এর আগে শুক্রবার ভোরে ওই সীমান্ত দিয়ে ওই ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে কঠোর নজরদারির কারণে তাঁরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি বলে জানিয়েছে বিজিবি। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা প্রধানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, মানুষগুলা রাতে বৃষ্টির সময় খুব কষ্ট করে সেখান ছিল। একজন বয়স্ক মানুষ আর বাচ্চাগুলো বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপছিল।

মো. হানিফ নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ওরাও তো মানুষ, ওদের কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে। ঝড়বৃষ্টির রাতে ফাঁকা জায়গাটাতে ওরা খুব কষ্টে ছিল। আমরা চাই, ওদের ভারত সরকার নিয়ে যাক, না হলে বাংলাদেশ সরকার কোনো একটা ব্যবস্থা করুক। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হলো না।’

নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভারতে ৯৩ বিএসএফ ব্যটালিয়ন কমান্ডারের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করেছি। সেখানে আমি তাঁদের ফেরত নিতে রিকুয়েস্ট করেছি। কিন্তু তারা (বিএসএফ) বলেছে যে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক, তাঁদের নিতে পারবে না। আমি বলেছি যে তাঁরা ভারতের অভ্যন্তরে ছিলেন, ইন্টারন্যাশনাল ল (আইন) মেনে তাঁদের আইসিপি (ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট বা সমন্বিত চেকপোস্ট) দিয়ে ফেরত পাঠানো উচিত। কারণ, রাতের অন্ধকারে বর্ডার ক্রস করে ঠেলে দেওয়া অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। রাতের বেলা বৃষ্টির মধ্যে ছিলেন, বজ্রপাত ছিল। এভাবে তো মানুষকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া ঠিক নয়।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তারপর তারা (বিএসএফ) বলেছে যে তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবে, জানাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই ব্যক্তিদের ফেরত নিতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমরাও আমাদের পজিশন তাদের স্পষ্ট করেছি যে আমরা এভাবে কাউকে গ্রহণ করব না। তাঁরা যদি বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে যথাযথ প্রসিডিউর অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল ল অনুযায়ী পাঠালে আমরা তাঁদেরকে গ্রহণ করব। বাট, এভাবে কোনো প্রকার পুশ ইন আমরা একসেপ্ট করব না।’