‘গতর খাইটা সংসার চালাই, কারও কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে’

প্রতিবন্ধিতা সত্ত্বেও ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালান সুভাষ চন্দ্র বর্মণ (৪৫)। সোমবার দুপুরে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

শৈশব থেকে স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না সুভাষ চন্দ্র বর্মণ (৪৫)। তাঁর কিছু কথা বোঝা যায়, আবার কিছু দুর্বোধ্য। তাঁর পা দুটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চিকন। এ জন্য বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না, এরপর বসতে কিংবা জিরোতে হয়। এসব শারীরিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধিতা জয় করে ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসারের ঘানি টানছেন সুভাষ। তবু ভিক্ষা বা করুণার হাত পাতেন না কারও কাছে।

সুভাষের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার বাইশপুর এলাকায়। ওই এলাকার মৃত নকুল চন্দ্র বর্মণের ছেলে তিনি। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুভাষ সবার বড়। শৈশব থেকে তিনি কিছুটা বাক্‌ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রায় ১০ বছর ধরে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মতলব সেতু এলাকায় তাঁকে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে দেখা যায়।

গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলা সদরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফটকের সামনে ঝালমুড়ি বিক্রি করছিলেন সুভাষ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার কিছুক্ষণ টুলে বসে এ কাজ করছিলেন। সেখানে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর নানা কষ্টের কথা।

সুভাষ বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না, মুখে কথা আটকে যায়। সেই সঙ্গে তাঁর দুই পা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চিকন এবং শরীর দুর্বল থাকে অধিকাংশ সময়। অনেক আগেই মারা যান তাঁর বাবা। পৈতৃক কোনো সম্পদও তাঁর নেই। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় সংসারের হাল ধরেন কিশোর বয়স থেকে। প্রথমে কয়েক বছর চা বিক্রি করতেন। এরপর প্রায় ১০ বছর ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মতলব সেতু এলাকায় ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন। এ থেকে প্রতিদিন তিনি আয় করেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। তিনি কোনো প্রতিবন্ধী ভাতাও পান না।

আবহাওয়া ভালো না থাকলে বা শরীর বেশি খারাপ থাকলে সেদিন ঝালমুড়ি বিক্রি করেন না সুভাষ। তিনি বলেন, মাসে গড়ে ২৪ থেকে ২৫ দিন তিনি এ কাজ করেন। এ থেকে তাঁর আয় হয় ৭ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা, যা দিয়ে তাঁর সংসার চলে না ঠিকমতো। স্ত্রী, এক সন্তান, মাসহ পরিবারের সদস্যদের কাপড়চোপড়, ওষুধ কেনাসহ অন্য খরচ চালাতে হয়। এ জন্য মাঝেমধ্যে দোকান থেকে বাকিতে জিনিসপত্র কেনেন।

আধো আধো স্বরে সুভাষ চন্দ্র বলেন, ‘৩০ বছর ধইরা গতর খাটি। ঝালমুড়ি বেচনের টেয়ায় জোড়াতালি দিয়া সংসার চালাই। অনেকে আমারে নিয়া হাসিঠাট্টাও করে। তয় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি, রুজির টেয়ায় ঠিকমতো খাইতে পারি না। গতর খাইটা সংসার চালাই, এইডাই শান্তি। কারও কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে।’

ওই ঝালমুড়ি বিক্রেতাকে প্রায় প্রতিদিন দেখেন জানিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) রাজিব কিশোর বণিক বলেন, শারীরিক সমস্যা জয় করে তিনি যেভাবে পরিশ্রম করে উপার্জন করছেন, তা বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

জানতে চাইলে মতলব দক্ষিণ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা টিটু চন্দ্র ধর বলেন, সুভাষের বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তাঁর ভাতার ব্যাপারে কেউ যোগাযোগ করেননি। ঈদের পর তাঁকে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।