বাঘায় ঈদের সঙ্গে আসে মেলা

বাঘার ঐতিহ্যবাহী ঈদমেলা শুরুর আগেই বসে গেছে শতাধিক মিষ্টির দোকানছবি: প্রথম আলো

মেলায় সার্কাসের প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে, শুনেই ছুটে এসেছেন জমশেদ আলী। তাঁর আক্ষেপ, ২০২০ সালে করোনার পর থেকে ভালোভাবে এই মেলা জমেনি। সার্কাস এসেছে, এবার মেলা জমবে। হা করে তাকিয়েছিলেন প্যান্ডেল বানানোর সব আয়োজনের দিকে। চলছে মৌলভীবাজারের জুড়ী থেকে আসা ‘দি নিউ লাকি সেভেন সার্কাসে’র কর্মযজ্ঞ। জমশেদ বললেন, ‘বয়স ৭০ বছর হইচে। একবারও মেলায় আসা বাদ দিইনি।’ এই ঈদমেলা নিয়ে রাজশাহীর বাঘার মানুষের আবেগটা এ রকমই।

বাঘায় ঈদ আসে, সঙ্গে নিয়ে আসে এই মেলা। রাজশাহীর বাঘার মানুষের কাছে ঈদের আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করে ঈদমেলা। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এ মেলা হয়ে ওঠে সব মানুষের মিলনমেলা। প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ঈদমেলা প্রতিবছর ঈদের দিন থেকে শুরু হয়। চলে সপ্তাহব্যাপী। এবার চলবে দুই সপ্তাহ। তবে ৫ মার্চ এই মেলা ডাক হয়েছে। তার পর থেকেই দোকানপাট বসতে শুরু হয়েছে। সেসব দোকানপাটে বেচাকেনাও শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে দর্শনার্থী আসছেন রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া থেকে। আগে এই মেলায় পদ্মা নদী পার হয়ে ভারত থেকেও দর্শনার্থীরা আসতেন।

এই আয়োজনকে ঘিরে বাঘা ওয়াক্ফ এস্টেট চত্বরে মেলা বসে। এখান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার পশ্চিমে বাঘা হাইস্কুল মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এই মেলা করা যায়নি। পরের তিন বছর মেলা ভালোভাবে করা যায়নি। গত বছর মেলা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে মনে করা হচ্ছে এবারের মেলা আগের মতোই জমজমাট হবে।

এবার দুই সপ্তাহের জন্য ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় এ মেলা ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে অতীতে সাড়ে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত মেলার ডাক উঠেছে। এ প্রসঙ্গে মেলার এবারের ইজারাদার রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য শফিকুল ইসলাম বললেন, অতীতে মেলায় অনেক অসামাজিক কর্মকাণ্ড হয়েছে। এবার মেলায় সে ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড হবে না। বাঘার ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঈদমেলার যে সুস্থ বিনোদন, সেটাই তিনি উপহার দেবেন। এ জন্য তিনি সবার সহযোগিতা চান।

গত বুধবার (১৮ মার্চ) বাঘা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে গিয়ে জানা গেল, সার্কাসের দলে এসেছেন ৭৫ জন নারী-পুরুষ। তাঁরা প্যান্ডেল তৈরির কাজ করছেন। দাঁড়িয়ে থেকে এই কাজ দেখছেন বাঘা উপজেলার মীরগঞ্জ এলাকার ৬৫ বছর বয়সী মতলেব হোসেন।  তিনি বললেন, ‘ছুটুকল থাইকি আমরা এই মেলাত আসি। মাঝখানে কয়েক বছর বন্ধ ছিল। এইবির মেলা লাগিচে শুনিই দেখতে আইচি।’ এই মাঠেই মৃত্যুকূপ খেলা, জাদু প্রদর্শনীর জন্য প্যান্ডেল প্রস্তুত করা হচ্ছে।

সার্কাসের মালিক রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা আপনাদের সুস্থ বিনোদনের জন্য সার্কাস উপহার দেব। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করব।’   

দেখা গেল, বাঘা মাজার চত্বরে নাগরদোলাসহ বিনোদনমূলক অন্যান্য রাইড বসানোর কাজ চলছে। কোনো কোনোটি বসানোর কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মেলায় হরেক রকম মিষ্টির দোকানে ভিড় লেগে থাকে তেঁতুলতলার মাঠে। এবার সেখানে ইতিমধ্যে সারি সারি দোকান বসে গেছে।

নাটোরের নলডাঙ্গা থেকে সজীব প্রামাণিক মিষ্টির দোকান নিয়ে এসেছেন। বললেন, বেচাকেনা শুরু হয়ে গেছে। বাঘা এলাকার মিষ্টির দোকানি আমজাদ আলী তেঁতুলতলার মাঠে মিষ্টির দোকান দিয়েছেন। তিনি বললেন, ১৫ রোজা থেকে মেলা ডাক হয়েছে। তখন থেকেই বসে গেছেন। কয়েক বছর বাদে মেলা হচ্ছে। এবার ভালো বেচাকেনা হচ্ছে।

মেলায় নাটোরের লালপুর থেকে দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন রতন কুমার সরকার (৩৩)। মেয়ে রাখি সরকার দ্বিতীয় শ্রেণিতে ও দীপ্তি সরকার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।  রতন কুমার বলছেন, তাঁর মেয়েরা মেলায় বেলুন কিনবে। আর বাড়ির জন্য জিলাপি নেবে। মেলায় এসে তারা খুব খুশি।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার বজলুর রহমান তাঁর স্ত্রী ও চার বছরের এক সন্তানকে নিয়ে মেলায় এসেছেন। মিষ্টিপট্টিতেই তাঁর দেখা পাওয়া গেল। তিনি বললেন, ঈদের আগের দিন ও পরের দিন খুব ভিড় হবে। ভালোমতো ঘুরে মেলা দেখা যায় না। তাই এবার একটু আগেই এসেছেন। গায়ে বাতাস লাগিয়ে বেড়ানো যাচ্ছে। খুব ভালো লাগছে।