বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের বাড়িতে থাকে না: শফিকুর রহমান
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এ সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। আমরা ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। এখন যাঁরা নতুন করে ফ্যাসিবাদ শুরু করবেন, তাঁদের ১৫ বছর আর অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা কারও চোখ রাঙানি সহ্য করব না। আমরা যেখানে বাধা পাব, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’
আজ শনিবার বিকেল চারটায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার মহিপাল এলাকায় ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চের পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।
দেশের চলমান বিদ্যুৎ–সংকট ও গণহত্যার বিচারের প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে। সংসদে বিদ্যুৎ থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে না। গত ছয় মাসে শাপলা চত্বরে গণহত্যা, পিলখানার হত্যার মতো বড় বড় গণহত্যার বিচার শুরু হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যতগুলোর বিচার শুরু হয়েছিল, তার অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কারও মামার বাড়ি বা পিসির বাড়ি নেই। আমরা এ দেশেই জন্ম নিয়েছি। এ দেশ আমাদের ঠিকানা। আমরা তরুণদের হাতে দেশ তুলে দিতে চাই।’
জামায়াত ও এনসিপির সিনিয়র নেতাদের উপস্থিতিতে সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান সরকার গণ-অভ্যুত্থানের কোনো আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। র্যাব বিলুপ্ত না করে নতুন নামে আনছে সরকার। বিএনপি সিন্ডিকেট করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে। বিএনপি দুর্নীতি করলে দেশের মানুষ ছাড় দেবে না। ১১–দলীয় নেতা-কর্মীর ওপর নির্যাতন করা হলে বিএনপিকে আমরা ছাড় দেব না। আঘাত দিলে পাল্টা আঘাত আসবে। লংমার্চের পর ঢাকায় জনসভা করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আত্মবিশ্বাস নেই। তারা গণভোটের রায় মানছেন না। আমরা জোর করে হলেও তাদের গণভোটের রায় মানাতে বাধ্য করব। হাসিনা চলে গেলেও এ সরকার তাদের আদলে দেশ চালাচ্ছে। শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ। তাঁর ডাকে ভবিষ্যতে সকল আন্দোলন–সংগ্রামে আপনারা পথে নেমে আসবেন বলে আশা করছি।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ ভালো নেই। দেশে গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। বিএনপি চাঁদাবাজি শুরু করেছে। অদক্ষ লোকজনকে মন্ত্রী বানানো হয়েছে। বিএনপির নেতারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে লাখ টাকা নিয়ে তাদের নেতাদের জামিন করাচ্ছে। বিএনপির ওপর আমাদের আর আস্থা নেই। আগামীর বাংলাদেশ তারেক রহমানের নয়, শহীদ ওসমান হাদির বাংলাদেশ হবে। দাবি না মানলে আজকের লংমার্চের ছয় দফা দাবি ভবিষ্যতে এক দফায় রূপ নেবে।’
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা সংস্কার ও জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শক্তি। ৭০ শতাংশ লোক গণভোটের পক্ষে রায় দিলেও ৫০ শতাংশ জনগণের ভোটে জয়ী সরকার তা বাস্তবায়ন করছে না। এক মায়ের এক সন্তান বৈধ হলে অপর সন্তান অবৈধ হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষকে সংবিধান সংশোধনের নামে হাইকোর্ট দেখিয়ে লাভ নেই। বিগত সময়ে সংবিধান সংশোধনের পর তা ১৭ বার বাতিল হয়েছে। বিএনপি চরম দলীয়করণের মাধ্যমে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করছে। গণভোটের রায় না মানলে আমরা বিএনপিকে চূড়ান্তভাবে লাল কার্ড দেখাতে বাধ্য হব।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বর্তমান রাষ্ট্রপতি বিএনপির মহাসচিব থাকাকালে সাবেক সরকারের সময় তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। আমরাও সেই আন্দোলন করছি। আমাদের লংমার্চের মহিপালের পথসভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।’
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন গণমানুষের জন্য হয়েছে। লংমার্চ দিয়ে ১১–দলীয় ঐক্যের আন্দোলন শুরু হলো। পরে সেটি ঢাকা ঘেরাও দিয়ে শেষ হবে। তবে এখনই ঢাকা ঘেরাও করার পরিকল্পনা নেই। আমাদের প্রতিটি আন্দোলন হবে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত এক একজন শহীদের নামে।’
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ‘আমাদের লংমার্চে তেলের টাকা কোত্থেকে আসছে সেটা আপনাদের চিন্তা না করে জনগণের জন্য তেলের ব্যবস্থা করেন। তেল দিতে না পারলে ১১–দলীয় জোটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যান।’
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের পকেট কাটা শুরু করেছে। তারা গণভোটের রায় নিয়ে নয়-ছয় করা শুরু করেছে। যার কোনো সুযোগ নেই। সরকার গণভোটের রায় মেনে বিরোধী দল থেকে সংসদের স্থায়ী কমিটিতে সভাপতি দেওয়া হয়নি।’
এর আগে আজ শনিবার সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চ শুরু হয়। লংমার্চটি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা করার কর্মসূচি রয়েছে। এর অংশ হিসেবে কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, চৌদ্দগ্রাম ও ফেনীত পথসভার আয়োজন করা হয়েছে।
১১–দলীয় ঐক্যের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে আছে—অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
ফেনীতে পথসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য কামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব মাওলানা আতা উল্লাহ আমিন, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিনসহ ১১–দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। লংমার্চ ও পথসভার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রাম অভিমুখী লেনের গাড়িগুলো ঢাকা লেন হয়ে চলাচল করছিল। এ কারণে মহাসড়কে দীর্ঘ গাড়ির জট তৈরি হয়েছে।