দ্বীপ জেলা ভোলায় গ্যাসের প্রাচুর্য, তবে গতি নেই শিল্পায়নে

ভোলার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা ৭০-৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকি গ্যাস উদ্বৃত্ত থাকছে।

ভোলা সদর উপজেলায় জাঙ্গালিয়া নদীর তীরে চর ভেদুরিয়ায় ৫৮ একর জমির ওপর নতুন শিল্পপার্ক তৈরি করছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এখন চলছে কাঠামো তৈরির কাজ। ১১ মে তোলাছবি: প্রথম আলো

ভোলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ চরপাতা গ্রাম। বছর তিনেক আগে সেখানে গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। সেই ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র এরই মধ্যে গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত। তবে উৎপাদন থেমে আছে। কারণ, ভোলায় বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।

বাপেক্সের হিসাবে ভোলায় বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত আছে। এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। ১৯৯৫ সালে ভোলায় প্রথম শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা থেকে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।

একের পর এক গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ায় ভোলার বাসিন্দারা সম্ভাবনার নতুন আশা দেখেছিলেন। কিন্তু সেই আশার বড় অংশ এখনো অপূর্ণ। কারণ, গ্যাসের প্রাচুর্য থাকলেও পুরো সুবিধা পাচ্ছেন না জেলার বাসিন্দারা। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর হিসাব বলছে, ভোলায় যে পরিমাণ গ্যাস আছে, তা দিয়ে যদি পুরোদমে জেলায় শিল্পায়ন গড়ে ওঠে, তাহলে অন্তত ৭০ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

এখানেই শিল্পকারখানা গড়লে গ্যাস কম খরচে ব্যবহার করা যাবে। পণ্য ভোলার পাশেই নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে নেওয়া যাবে।
গোলাম নবী আলমগীর, সভাপতি, ভোলা চেম্বার অব কমার্স

বিভিন্ন সরকার ভোলার গ্যাস নিয়ে মোট চারটি পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে আছে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়া, সিএনজিতে রূপান্তর করে জেলার বাইরে নেওয়া, এলএনজি করে জেলার বাইরে নেওয়া এবং ভোলাতেই ইপিজেড, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে সেখানে গ্যাস ব্যবহার করা। সরকারগুলোর তরফে এগুলো নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগও হয়েছে। তবে কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, ইপিজেড ও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করাই সবচেয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী পরিকল্পনা। এটি বাস্তবায়ন করলে যেমন ভোলার অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে যাবে, তেমনি গ্যাসের সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হবে এটির মাধ্যমে। এই দাবিতে ভোলার মানুষও দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন।

কোথায় কতটুকু যাচ্ছে গ্যাস

ভোলায় গ্যাস উত্তলোনের কাজটি করছে বাপেক্স। সেই গ্যাস কিনে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করে সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। কোম্পানিটি বলছে, বড় গ্রাহকদের মধ্যে এখানে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি ক্যাপটিভ (শিল্পে উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুৎ) ও সাতটি শিল্পকারখানা আছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৩৪৪টি আবাসিক (নন-মিটার) এবং ৩১টি মিটারভিত্তিক গ্রাহককে সংযোগ দিয়েছে তারা। তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন আবাসিক সংযোগ দেওয়া বন্ধ আছে।

এ শিল্পপার্ক পুরোপুরি চালু হলে ভোলার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
আর এন পাল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আরএফএল গ্রুপ

সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপক অলিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ভোলার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বর্তমানে দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে চাহিদা ৭০-৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকায় ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস রয়েছে। যেকোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান চাইলে সেখানে গ্যাস–সংযোগ নিতে পারে।

ভোলায় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসের জন্য আবেদন করলে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে তা অনুমোদন করা হচ্ছে জানিয়ে অলিউল ইসলাম বলেন, একটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস–সংযোগ দিতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে প্রাথমিক সম্মতিপত্র গ্রহণ, মন্ত্রণালয়ের পূর্ব অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে কোম্পানির বোর্ডের অনুমোদন। দাপ্তরিক ও নির্মাণকাজ শেষ করে গ্যাস কমিশনিংয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত সংযোগ দেওয়া হয়।

ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে শিল্পকারখানা

ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া, ভেলুমিয়া, চরসামাইয়া ও শিবপুর ঘিরে গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নের কেন্দ্র ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট সড়ক ধরে ভোলা শহরে আসার পথে ব্যাঙ্কেরহাট বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভোলা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। এর পাশের মাঝিরহাট এলাকায় রয়েছে একটি গ্যাসক্ষেত্র। ভেদুরিয়া ও ভেলুমিয়া ইউনিয়নের চারপাশে জাঙ্গালিয়া ও তেঁতুলিয়া নদী থাকলেও সড়ক যোগাযোগ ভালো।

ভোলা খেয়াঘাট, শান্তিরহাট ও বাঘমারা সেতু দিয়ে জেলার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে মালবাহী যানবাহন ও মানুষ চলাচল করে। ভেলুমিয়া ও ভেদুরিয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সরকারের কাছে কয়েকবার প্রস্তাব পাঠিয়েছে ভোলার প্রশাসন।

গত ১১ মে সরেজমিন দেখা যায়, ভোলার ব্যাঙ্কেরহাট থেকে জেলা শহরের দিকে যাওয়ার পথে সড়কের ডান পাশে চরকালী মৌজায় গড়ে উঠছে আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। উর্মি গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠান কয়েকটি প্লটে জমি কিনে সাইনবোর্ড টানিয়েছে। জমি ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। গ্যাসের অনুমোদনও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে।

নদীপথে ভোলা শহরে ঢোকার সময় জাঙ্গালিয়া নদীর তীরে সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশার সদুর চর মৌজায় প্রায় ১০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে শেল্‌টেক্‌ সিরামিক কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি অনেক আগেই উৎপাদনে গেছে। উৎপাদিত পণ্য জাহাজ ও ট্রাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশে পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জাঙ্গালিয়া নদীর তীরের চর সামাইয়া ইউনিয়নেও একাধিক প্রতিষ্ঠান জমি কিনেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েকটি ইটভাটা, অটো রাইসমিল ও হিমাগার। অটো অ্যাডভান্স টেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান গ্যাস ব্যবহার করে ইট উৎপাদন করছে। কাজী ফিডও একটি সিরামিক কারখানা নির্মাণের জন্য জমি কিনে রেখেছে। এ ছাড়া ভোলা খেয়াঘাট লঞ্চঘাট ও খেয়াঘাট সেতুর কাছে কাজী ফিড কোম্পানি ‘সাগরিকা ফিড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান অনেক আগেই চালু করেছে।

সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের শান্তিরহাট এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে প্রায় ১০০ একর জমি ভরাট করেছে একটি চীনা কোম্পানি। সেখানে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে।

ভোলা বিসিকের উপপরিচালক (সদ্য বদলি) মো. সোহাগ জানান, বিসিকে বর্তমানে ২৭টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আছে, আরও প্লট থাকলেও গ্যাস অনুমোদন জটিলতায় নতুন শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপক অলিউল ইসলাম বলেন, ভোলায় ৯টি প্রতিষ্ঠান গ্যাস–সংযোগের অনুমোদন পেয়েছে; এর মধ্যে ৭টি উৎপাদনে আছে। বাকি দুটি আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল ও প্রাণ-আরএফএল এখনো চালু হয়নি।

এদিকে নতুন করে জারি অ্যান্ড ফুডস, কাজী সিরামিকসসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গ্যাস–সংযোগের জন্য আবেদন করেছে।

বিপুল কর্মসংস্থানের আশা

বরিশাল বা ঢাকা থেকে লঞ্চে ভোলার প্রবেশমুখে জাঙ্গালিয়া নদীর তীরে ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাটের মাঝামাঝি চর ভেদুরিয়ায় ৫৮ একর জমির ওপর প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের নতুন শিল্পপার্ক তৈরির কাজ চলছে। এ পর্যন্ত জমি ক্রয়, ভরাট, নদীভাঙন থেকে জমি সুরক্ষা, কিছু আবাসন ও অফিস নির্মাণ, লাইসেন্স এবং শিল্প অনুমোদনসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পুরোদমে চালু হলে এই শিল্পপার্কে ২৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তেঁতুলিয়া নদীর তীরে অবস্থান হওয়ায় নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে সহজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতুর ভোলা প্রান্তও এ এলাকার কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল প্রথম আলোকে বলেন, এ শিল্পপার্কটি পুরোপুরি চালু হলে ভোলার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে। স্থানীয় জনগণের জন্য ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া এ জেলার মানুষের কাজের জন্য জেলার বাইরে যেতে হবে না। অন্যত্র যাতায়াতের জন্য তাদের বর্তমানে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, সেটি আর থাকবে না।

খেয়াঘাট এলাকায় সাগরিকা ফিড ভোলার প্রথম গ্যাসভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে উৎপাদনে আছে। স্থায়ী, অস্থায়ী মিলিয়ে সেখানে ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। ভোলা-বরিশাল সেতু হলে আরও ৩০০ কর্মী দরকার হবে।

প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক নাসিমুল আলম বলেন, ভোলা-বরিশাল সেতু না থাকায় তাঁদের ফেরিতে খরচ বেশি পড়ছে। এখানে শিল্পকারখানা করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক প্রভাব। তিনি নির্মাণসামগ্রী ও বালুর দামে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপকেও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।

ভোলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে কিংবা গাড়িতে করে নেওয়া অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু এখানেই শিল্পকারখানা গড়লে গ্যাস কম খরচে ব্যবহার করা যাবে। উৎপাদিত পণ্য ভোলার পাশেই নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে নেওয়া যাবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝামেলাহীনভাবে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতে ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বেকারত্ব দূর হবে।

৩০০ গুণ পর্যন্ত দাম বেড়েছে জমির

শিল্পায়নের প্রভাবে ভোলায় জমির দামও বেড়েছে দ্রুতগতিতে। গত ৩০ বছরে জেলার কোথাও কোথাও জমির দাম ৩০০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

ভোলার পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. মানিক মিঞা ১৯৯৬ সালে দক্ষিণ চরনোয়াবাদ মৌজায় সালে ১০ হাজার টাকায় পৌনে তিন শতাংশ জমি কিনেছিলেন। বর্তমানে সে জমির দাম শতাংশপ্রতি চাওয়া হচ্ছে ৮-১০ লাখ টাকা।

ভোলা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়েস্টার্নপাড়া এলাকায় আবদুর রব নামের এক ব্যক্তি ২০০৫ সালে ১৩ লাখ টাকায় ৫ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। বর্তমানে সে জমির বিক্রয়মূল্য প্রতি শতাংশ ২৫ লাখ টাকা।

২০০৫ সালে ভোলা পৌরসভার বাজারের মনিহার পট্টির একটি জমি আবুল কাশেম নামের এক ব্যক্তি কিনেছিলেন ১৬ লাখ টাকায়। এখন সেটির দাম উঠেছে আড়াই কোটি টাকা।

ভোলায় এখন জমির সবচেয়ে বেশি দাম কালীবাড়ি রোড ও ওয়েস্টার্নপাড়া এলাকায়। সেখানে শতাংশ ২০-২৫ লাখ টাকায় জমি বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া গ্রামীণ এলাকাগুলোয় শতাংশ এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাপ্তা ইউনিয়ন ভোলা শহরতলির একটি ইউনিয়ন। সেখানকার বাসিন্দা আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ২০০০ সালে ইউনিয়নের চরনাপ্তা মৌজায় ৪৪ হাজার টাকায় ১২ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। অর্থাৎ শতাংশ পড়েছিল ৪ হাজার টাকায়। সম্প্রতি প্রতি শতাংশ জমি তিনি ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।

ভোলার মানুষের আন্দোলন চলছেই

ভোলার গ্যাসের উৎস সম্পর্কে প্রথম জানা যায় সুইডিশ ফ্রি মিশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে। আশির দশকের শুরুর দিকে নলকূপ দিয়ে পানির সঙ্গে অনবরত গ্যাস বের হতে দেখে তারা সেটি পরীক্ষা করে। এরপর আগুনের সংযোগ দিয়ে চুলা বসিয়ে রান্নাবান্না শুরু করে তারা। এটি দেখে স্থানীয় সাংবাদিকেরা সংবাদ প্রকাশ করেন, যার ফলে পরবর্তী সময়ে বাপেক্স সেখানে আসে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাপেক্স আশির দশকের শেষ দিকে গ্যাসক্ষেত্র খোঁজার কাজ শুরু করলেও একপর্যায়ে তারা সফল হবে না বলে চলে যেতে চেয়েছিল। তখন ভোলার স্থানীয় মানুষ এবং ঢাকা থেকে জাতীয় তেল-গ্যাস ও বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্যরা মিলে আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে ভোলায় আবার গ্যাসের সন্ধান চালায় বাপেক্স। ১৯৯৫ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে প্রতিষ্ঠানটি। সেখান থেকে উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে।

ভোলায় গ্যাস সরবরাহ শুরুর পর প্রায় ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়ে বাসাবাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়। এখন ২ হাজার ৩০০টির বেশি বাসায় গ্যাসের সংযোগ আছে। তবে বর্তমানে নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ আছে।

২০২৩ সালের ২১ মে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি বেসরকারি কোম্পানি ইন্ট্রাকোর সঙ্গে একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, ইন্ট্রাকো সরকারের কাছ থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ১৭ টাকা দরে কিনে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলার শিল্পকারখানায় ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা দরে বিক্রি করবে। একই বছর ট্রাকে করে ভোলার গ্যাস ঢাকায় নেওয়া শুরু হয়। এর প্রতিবাদে ভোলায় পাওয়া গ্যাস দিয়ে জেলার উন্নয়নসহ পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নে আন্দোলন শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নানা সময়ে গ্যাস নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে ইন্ট্রাকোর ট্রাক আটকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

চুক্তি অনুযায়ী ইন্ট্রাকোর দিনে নেওয়ার কথা ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। কয়েক বছর তারা ৮ লাখ থেকে ৯ লাখ ঘনফুট গ্যাস নিয়েছে। তবে বিস্ফোরক লাইসেন্স না থাকায় গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি গাড়ি চলার অনুমতি বন্ধ হওয়ায় বর্তমানে ইন্ট্রাকো ভোলা থেকে দৈনিক গ্যাস নিতে পারছে গড়ে তিন লাখ ঘনফুটের মতো।

গ্যাস নিয়ে জেলার বাসিন্দারা পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন করে আছেন। এগুলো হলো ভোলার প্রতিটি ঘরে গ্যাসের সংযোগ দিতে হবে। গ্যাসভিত্তিক বৃহৎ সার কারখানা স্থাপনসহ ভোলায় শিল্প, কলকারখানাসহ ইপিজেড গড়ে তুলতে হবে। ভোলায় একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করতে হবে এবং যে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে, সেটির আধুনিকায়ন করতে হবে। দ্রুত ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে। বালু উত্তোলন বন্ধসহ ভোলার চারপাশের নদীতীর স্থায়ীভাবে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং ভোলায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।

ভোলা জেলা প্রশাসক শামীম রহমান বলেন, সম্প্রতি শেষ হওয়া ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেছেন, ভোলার গ্যাস ভোলায় ব্যবহার করে যদি ভোলাতেই শিল্পকারখানা, সার কারখানা গড়ে তোলা যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা সহজেই পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে উৎপাদিত পণ্য পৌঁছাতে পারবেন। ভোলাতে পর্যাপ্ত জমি আছে। এখানে শিল্পকারখানা নির্মাণ হলে অবহেলিত ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বেকারত্ব দূর হবে।

‘সম্পদশালী জেলা উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে’

১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলার মর্যাদা পাওয়া ভোলা এখনো দেশের দরিদ্র জেলাগুলোর একটি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের প্রকাশিত জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে (এমপিআই) বলা হয়, দেশে ২৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে রয়েছে। এর মধ্যে ভোলাসহ ৫টি জেলায় ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। উল্লেখ্য, জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক অবস্থা পর্যালোচনা করে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক তৈরি করা হয়, যা শুধু আয় বা ভোগের মতো একক মাত্রার বাইরে গিয়ে দারিদ্র্যকে তার বিভিন্ন দিক থেকে বুঝতে সাহায্য করে।

জেলা তথ্য বাতায়নের তথ্য বলছে, ভোলায় প্রায় ১৯ লাখ ৩২ হাজার মানুষের বাস। জেলায় সাক্ষরতার হার ৬৭ দশমিক ২১ শতাংশ; যেখানে সারা দেশের সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে ভোলা অন্যতম বলে মনে করেন ভোলার গ্যাস রক্ষায় দক্ষিণাঞ্চলীয় নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই জেলায় এত সম্পদ, অথচ উন্নয়নের সূচকে এটি সব দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। ভোলার গ্যাস দিয়ে ভোলাতেই শিল্পের বিকাশ হলে বাংলাদেশের বৃহত্তর এই বদ্বীপের আর্থসামাজিক অবস্থা বদলে যাবে।’ ভোলা গ্যাসের ওপর ভাসছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘অথচ ভোলার উপকূলের গাছ কেটে জেলার অধিকাংশ পরিবারের রান্নার চুলার জ্বালানি জোগাতে হচ্ছে, ইটভাটায় ইট পোড়াতে হচ্ছে। আমরা চাই গাছ রক্ষা করতে। সে জন্য ঘরে ঘরে গ্যাস–সংযোগের কথা বলছি।’

ভোলায় যে গ্যাস পাওয়া গেছে, তা ব্যবহারে ভোলার অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ বদরূল ইমাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা—যা–ই হোক কেন, ওখানেই (ভোলা) করা যেতে পারে। পরিবহন করার যদি সুবিধা থাকে, সেটা পরে করা যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য গ্যাসের ব্যবহার আটকে রাখার কোনো কারণ নেই।’