ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালকদের বিরুদ্ধে চিকিৎসাধীন এক রোগীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে চিকিৎসাধীন প্রায় ৪০ রোগী একসঙ্গে পালিয়ে গেছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ‘প্রয়াস’ নামে মাদক নির্ভরশীলদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে।
মাদক নিরাময় কেন্দ্রের ভাষ্য, একজনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকার লোকজন এখানে ভাঙচুর চালায়। পরে ভর্তি থাকা রোগীরা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীরা লাফিয়ে পাশের ভবনের ছাদে পড়েন। সেখান থেকে তাঁরা পালিয়ে যান।
ওই রোগীর নাম মো. ফোরকান (২৯)। তিনি জেলার নবীনগর উপজেলার কুড়িঘর গ্রামের মো. রশিদ মিয়ার ছেলে। তিনি কাতারপ্রবাসী ছিলেন। গত ছয় মাস আগে কাতার থেকে ছুটিতে দেশে আসেন। দেশে আসার দুই মাস পর তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।
ফোরকানের ভগ্নিপতি ইমন হোসেনের ভাষ্য, শ্যালক ফোরকানকে সুস্থ করে তুলতে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু পাঁচ দিনের মাথায় তিনি ফিরলেন লাশ হয়ে। প্রয়াসের লোকজন চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে নির্যাতন ও মারধর করে হত্যা করেছে বলে তাঁর অভিযোগ।
ইমন হোসেনের অভিযোগ, প্রয়াসের লোকজন গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁর শ্যালককে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসক ইসিজিসহ অন্যান্য পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে তারা লাশ অ্যাম্বুলেন্সে রেখে তাঁকে কার্যালয়ে যেতে বলেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ উদ্ধার করে।
শ্যালক ফোরকানকে সুস্থ করে তুলতে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু পাঁচ দিনের মাথায় তিনি ফিরলেন লাশ হয়ে।
ফোরকানের পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক প্রমোদ বর্মণ। তাঁর ভাষ্য, ফোরকান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পরিবার মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। তিনি বলেন, ‘গতকাল স্থানীয় লোকজন আমাদের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভাঙচুর চালায়। সে সময় সেখানে চিকিৎসাধীন ৪০ জন রোগী পালিয়ে যান। বর্তমানে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে কোনো রোগী ভর্তি নেই।’
সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জীব কুমার পাল প্রথম আলোকে বলেন, ফোরকানের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
স্থানীয় লোকজন, প্রত্যক্ষদর্শী ও মাদক নিরাময় কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, জেলা শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় একটি ভবনের তৃতীয় তলায় ‘প্রয়াস’ এর অবস্থান। জেলা শহরের কান্দিপাড়ার বাসিন্দা রুবেল হক ও নরসিংদীর প্রমোদ বর্মণসহ ৮-১০ জন পরিচালক মিলে এটি পরিচালনা করেন।
গত মঙ্গলবার রাতে ফোরকানের মৃত্যু পর খবর ছড়িয়ে পড়ে, নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ও কর্মচারীদের নির্যাতনে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এতে সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দেয়। নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে গতকাল বুধবার দুপুরে তাঁরা সেখান থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
কেন্দ্রগুলোতে খণ্ডকালীন চিকিৎসক ও স্থায়ী নার্স থাকে। আমরা প্রতি মাসেই এগুলো পরিদর্শন করি। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, ঘটনা তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করবে পুলিশ।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীরা লাফিয়ে পাশের ভবনের ছাদে পড়েন। সেখান থেকে তাঁরা পালিয়ে যান।
মাদক নিরাময় কেন্দ্রের জানালা ভেঙে পাশের একটি ভবনের ছাদে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি জেলায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এর আগে ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল (৩০) নামের এক যুবককে হত্যার পর লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ আছে ‘প্রয়াস’-এর বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগের বিষয়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক প্রমোদ বর্মণ বলেন, ‘সে সময় আমি ছিলাম না, বিষয়টি জানি না।’
জেলায় অনুমোদিত ছয়টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের একটি ‘প্রয়াস’ জানিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজেদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন্দ্রগুলোতে খণ্ডকালীন চিকিৎসক ও স্থায়ী নার্স থাকে। আমরা প্রতি মাসেই এগুলো পরিদর্শন করি। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, ঘটনা তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করবে পুলিশ।’