সংকট পেরিয়ে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন

সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে মুদিদোকানে বসতে হয়েছে লাবিবকে। অভাবের সংসারে পড়ালেখার খরচের জন্য সেলাই মেশিন চালিয়েছে আরমিন। হঠাৎ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অসুস্থতায় চরম সংকটে পড়তে হয় ওমর ফারুককে। অর্থের অভাবে না খেয়ে থাকলেও পড়া থামায়নি মনিকা। তারা সবাই এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু স্বপ্নপূরণে পরবর্তী ধাপে যেতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য।

মুদিদোকান চালিয়ে জিপিএ–৫

দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল বরকত আলী শেখের। ছোট ছেলের জন্মদিনের কেক আনতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুতে চরম সংকটে পড়ে পরিবার। বড় ছেলে লাবিব তখন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সংসারের হাল ধরতে সে মুদিদোকান দেয়। দোকান চালানোর পাশাপাশি পড়ালেখা করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে।

লাবিবদের বাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার চরপাড়া গ্রামে। সে রাজবাড়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিল। লাবিব বলে, ২০১৮ সালের ১৪ মে দুর্ঘটনায় তাঁর বাবার মৃত্যুর পর সে নিজের ঘরে একটি মুদিদোকান দেয়। দোকান থেকে সামান্য কিছু আয় হয়। তার মা কাপড় সেলাই করেন। স্কুল থেকেও সে সহায়তা পেয়েছে। এভাবেই পড়ালেখা চালিয়েছে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা তার।

লাবিবের মা বিলকিস আক্তার বলেন, ছেলে ভালো ফল করলেও কলেজে ভর্তি, পোশাক, বই কেনাসহ নানা খরচ দিয়ে ছেলের পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়া নিয়ে তিনি চিন্তিত।

রাজবাড়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক প্রদ্যুত কুমার দাস বলেন, লাবিব স্কুলের পরীক্ষায় সব সময় ভালো ফল করত। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে সে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারবে।

কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে পড়ালেখা

দিনমজুর আবেদ আলী যে আয় করেন, তা দিয়ে সংসার চলে না। স্ত্রী আমেনা বেগম এবাড়ি-ওবাড়ি কাজ করে সহায়তার চেষ্টা করেন। তাঁদের দুর্দশা দেখে গ্রামের এক নারী দুই বছর আগে একটি সেলাই মেশিন কিনে দেন। সেই মেশিন দিয়ে বাড়িতে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছে আবেদ-আমেনা দম্পতির মেয়ে আরমিন নাহার। এবার সে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

আরমিনদের বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার রহিমাপুর মধ্যপাড়া গ্রামে। বড় হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার ইচ্ছা আরমিনের। তবে এই স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য। আরমিন বলে, ‘বাবা শ্বাসকষ্টের রোগী। ভারী কাজ করতে পারেন না। মায়ের আয়ে দুই বেলার খাবার জোটে না। তার ওপর আমাদের তিন বোনের লেখাপড়ার খরচ। জানি না আমার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না!’

সংসারের হাল ধরতে চায় মনিকা

নানা বাধা পেরিয়ে মনিকা ইসলাম এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু কারখানাশ্রমিক বাবার সামান্য আয়ে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে সে। তাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তালম পদ্মপাড়া এলাকায়। সে গুল্টাবাজার দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল।

মনিকা বলে, বাবা শরীফুল ইসলাম নরসিংদীতে পোশাক কারখানার শ্রমিক। মা হোসেনেয়ারা গৃহিণী। সংসারের প্রয়োজনে তাঁকে দরজির কাজ করতে হয়। বাবা বললেন, একটু সহযোগিতা পেলে মেয়েকে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ানো যেত।

গুল্টাবাজার দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘স্কুলে আমরা মনিকার পাশে ছিলাম। এমন মেধাবী ছাত্রীর দিকে একটু সহায়তার হাত বাড়ালে তার স্বপ্নপূরণ সম্ভব হবে।’

বাবার অসুস্থতায় সংকটে ফারুক

বাবা, মা ও দুই ভাই মিলে মোটামুটি ভালোই চলছিল ওমর ফারুকের। বড় ভাই রেজওয়ান আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। হঠাৎ বর্গাচাষি বাবা মকবুল হোসেনের (৬০) মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। সংসার চালানোর ভার পড়ে মায়ের ওপর। বাড়িতে হাঁস-মুরগি ও ছাগল পুষে যা আয় হয়, তা দিয়ে তিন বেলার খাবার জোটে না। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেই ফারুক এসএসসিতে জিপিএ–৫ পেয়েছে।

ফারুকদের বাড়ি নাটোর সদরের কামারদিয়াড় গ্রামে। তার মা জামেনা বেগম বলেন, অন্যের জমি বর্গা নিয়ে, মাঠে কাজকর্ম করে স্বামীর যা আয়; তা দিয়ে সংসার চলছিল। স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁদের জীবনে ছন্দপতন হয়েছে।

স্বামীর চিকিৎসার খরচ ও খাওয়া–পরার খরচ মিটিয়ে দুই ছেলেকে পড়াশোনা করানো তাঁর পক্ষে অসাধ্য হয়ে পড়েছে। ফারুক শিশুদের পড়িয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছে।

ওমর ফারুক বলে, বড় ভাই ডিপ্লোমা শেষ করে বিএসসিতে ভর্তি হতে চায়। আর উচ্চমাধ্যমিক শেষে বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন তাঁর। কিন্তু সবকিছুর অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সংকট। এই সংকট সে জয় করতে চায়, পড়াশোনা ভালোভাবে চালিয়ে যেতে চায়।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন প্রতিনিধি, নাটোর, রাজবাড়ী, তারাগঞ্জ, রংপুররায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ]