কীটনাশকে বাড়ছে ‘নীরব পরাগসংকট’, মৌপতঙ্গ রক্ষায় জাতীয় নীতির দাবি

রাজশাহীতে মৌপতঙ্গ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী নগরের একটি রেস্তোরাঁয়ছবি : প্রথম আলো

অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশে মৌমাছিসহ পরাগবাহী পতঙ্গের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন, প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদ, গবেষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই পরিস্থিতিকে ‘নীরব পরাগসংকট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা পরাগবাহী পতঙ্গ সুরক্ষায় জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

বিশ্ব মৌপতঙ্গ দিবস উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী নগরের একটি রেস্তোরাঁয় উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক (BARCIK) ও গ্রিন কোয়ালিশন-রাজশাহীর যৌথ আয়োজনে ‘বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট: কীটনাশকনির্ভর কৃষি, মৌপতঙ্গের মৃত্যু ও পরিবেশগত বিপর্যয়’ শীর্ষক নীতি আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে বারসিকের গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম ‘বাংলাদেশের নীরব পরাগসংকট, বিষাক্ত কীটনাশক ও পরিবেশ বিপর্যয়’ বিষয়ে একটি নীতিপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, অ্যাগ্রোকোলজি চর্চা বাড়ানো গেলে বহুপ্রজাতিক সংকট কমবে এবং পরাগবাহী পতঙ্গ সংরক্ষণ সহজ হবে। একই সঙ্গে খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায়ও সহায়ক হবে।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, দেশের ডাল, শর্ষে, শাকসবজি ও অধিকাংশ ফলমূলের উৎপাদন প্রাকৃতিক পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মৌপতঙ্গের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি আগাছানাশক ব্যবহারে মাঠের আইল ও রাস্তার ধারের বন্য গাছপালা নষ্ট হওয়ায় এসব পতঙ্গ খাদ্য ও আবাসস্থল হারাচ্ছে।

প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস বলেন, বিশ্বে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির মৌপতঙ্গের তথ্য রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে বা সংকটে রয়েছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা ও নথিভুক্ত তথ্য নেই। এ বিষয়ে গবেষণা এবং জাতীয় পর্যায়ে সুরক্ষা নীতিমালা জরুরি।

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা দরকার। বিষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

মৌচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে তাপমাত্রার ওঠানামা বেড়েছে, যা মৌমাছির জন্য ক্ষতিকর। আদর্শ তাপমাত্রার বাইরে গেলে মৌমাছির মৃত্যু বাড়ে এবং উৎপাদন কমে যায়।

কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবের উদাহরণ তুলে ধরে আরেক মৌচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, পবা উপজেলায় মধু সংগ্রহের সময় কীটনাশকের কারণে তাঁর প্রায় ১২০টি মৌবক্সের মৌমাছি মারা যায়।

পবা উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আগে মাঠে ভোমরা ও মৌমাছির উপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে পরাগায়ন হতো। এখন অনেক ফসলে অতিরিক্ত খরচ করে হাতে পরাগায়ন করতে হচ্ছে।

আলোচনায় বক্তারা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধ করা, পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণ, বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য বিশেষ পরিবেশগত সুরক্ষা কর্মসূচি এবং পরাগবাহী পতঙ্গ পর্যবেক্ষণে জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেন।