‘ধর, ধর’ বলে যুবককে তাড়া করেন অস্ত্রধারীরা, এরপর মাথায় গুলি করে হত্যা

নিহত হাসান রাজুছবি: সংগৃহীত

মুখে মাস্ক পরা পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তি। পরনে প্যান্ট ও টি-শার্ট। সবার হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র। গলির ভেতরে লোকজনের সামনেই তাঁরা অস্ত্র নিয়ে ‘ধর, ধর...’ বলে তাড়া করেন এক যুবককে। পালাতে থাকা যুবককে লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকেন মুহুমুর্হু গুলি। দৌড়ানোর একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন পালাতে থাকা যুবক। তখন তাঁকে পা দিয়ে চেপে ধরেন অস্ত্র হাতে থাকা ব্যক্তিরা। এরপর হত্যা করেন মাথায় গুলি করে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদে এভাবেই প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় বোনের বাসায় বেড়াতে আসা যুবক হাসান রাজুকে। এ সময় মাস্ক পরা ওই সব ব্যক্তির ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছে রেশমি আক্তার নামে ১২ বছরের এক শিশু। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে ঘটনার এ বিবরণ জানা গেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদের বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনি এলাকায়। হাসান রাজুকে গুলি করার ঘটনা কলোনির বাসিন্দাদের সামনে ঘটলেও কেউ ভয়ে এগিয়ে আসতে পারেননি।

চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের রৌফাবাদ থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিমে শহীদ মিনার এলাকার পাশে বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনি। সরু গলি দিয়ে কলোনিটির ৮০০ গজ ভেতরে গিয়ে অস্ত্রধারীরা হাসান রাজুকে হত্যা করেন।

ধর, ধর...চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখি পাঁচ থেকে ছয়জন মাস্ক পরা অস্ত্রধারী ব্যক্তি রাজুকে তাড়া করছে। কিছুক্ষণ পর টুসটাস শব্দ। হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাজু। এরপর তাকে পা দিয়ে চেপে ধরে একের পর এক গুলি করা হয়।
—ফরিদা আক্তার, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন ফরিদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘ধর, ধর... চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখি পাঁচ থেকে ছয়জন মাস্ক পরা অস্ত্রধারী ব্যক্তি রাজুকে তাড়া করছে। কিছুক্ষণ পর টুসটাস শব্দ। হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাজু। এরপর তাকে পা দিয়ে চেপে ধরে একের পর এক গুলি করা হয়।’

ফরিদা আক্তার আরও বলেন, ‘গলির দুই পাশে বাসা। গুলির শব্দে সব বাসা থেকে লোকজন বের হয়েছে। তবে মাস্ক পরা ব্যক্তিদের হাতে অস্ত্র থাকায় কেউ এগিয়ে যেতে সাহস করেনি। রাজুকে গুলি করে অস্ত্রধারীরা দ্রুত চলে যায়। তারা যাওয়ার পর দেখে গুলিতে আহত হয়ে এক শিশুও গলিতে পড়ে আছে। তার চোখে আঘাত লেগেছে। শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’

ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড়। গতকাল রাত সাড়ে ১১টায়
ছবি: প্রথম আলো

গতকাল রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে অন্তত পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। গলির ভেতরে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা জানান, এভাবে গলির ভেতরে বাইরের কেউ এসে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যার সাহস করবেন, সেটি তাঁদের কল্পনায়ও ছিল না। এ ঘটনার পর থেকে কলোনির বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।

পুলিশ জানায়, রাউজানের নাসির খুনের বদলা নিতে পরিকল্পিতভাবে রাজুকে খুন করা হতে পারে। পলাতক সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। কারণ, নিহত নাসির রায়হানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, গলির একটি অংশে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। আশপাশে উৎসুক লোকজনের ভিড়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে নিয়ে যাচ্ছে।

নিহত রাজুর বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কদলপুর এলাকায়। কয়েক দিন আগে তিনি বোনের বাসায় বেড়াতে আসেন। তাঁর বোন রুমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, নিহত রাজু পেশায় দিনমজুর। তাঁর সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না বলে জানান রুমা আক্তার।

কান্নাজড়িত কন্ঠে ভাই নিহত হওয়ার কথা জানাচ্ছেন বোন রুমা আকতার। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টায়
ছবি: প্রথম আলো

ঘটনাস্থলে আসা পুলিশ কর্মকর্তারা গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ভুক্তভোগীর অবস্থান জেনে প্রশিক্ষিত শুটাররা কলোনির ভেতরে গিয়ে লোকজনের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছেন। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর হত্যায় জড়িত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।’

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ববিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল রাউজানের কদলপুর এলাকায় নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় নিহত নাসিরের মেয়ে লাভলী আক্তার হাসান রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন। নাসির প্রবাসফেরত ও যুবদলের কর্মী ছিলেন। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি।

পুলিশ জানায়, রাউজানের নাসির খুনের বদলা নিতে পরিকল্পিতভাবে রাজুকে খুন করা হতে পারে। পলাতক সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। কারণ, নিহত নাসির রায়হানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

নগর ও রাউজানের অন্তত ১৪টি খুনের ঘটনায় রায়হানের নাম উঠে এসেছে। কিন্তু পুলিশ তাঁকে এখনো ধরতে পারছে না। রায়হান বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

নিহত রাজুর মা সখিনা বেগম রাতে প্রথম আলোকে বলেন, গত মাসের ১৪ তারিখ একটি কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছেন হাসান রাজু। মেয়ের মুখে বাবা ডাক তাঁর শোনা হলো না। সখিনা বেগম আরও বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়। যারা আমার ছেলেকে মেরেছে, আমি তাদের শাস্তি চাই।’