রেলস্টেশনের পাশে পামগাছের ‘বুনো সংসার’
ঢালাই করা পাকা পথ দিয়ে ঢুকতেই রেলস্টেশনের ভবন। এর অল্প দূরে উত্তর-পশ্চিমে এক সারি গাছ। দুপুরের ঝকঝকে রোদে পাতাগুলো মৃদু হাওয়ায় নাচছে। শীতের মৌসুম; অনেক দিন বৃষ্টি হয়নি। গাছের পাতা ধূলায় ধূসর হয়ে আছে, সবুজ রং অনেকটাই ম্লান। রেললাইন ধরে সামনে গেলেই গাছগুলো চোখে পড়ে। গাছজুড়ে খাঁজ, মাথায় ঝাঁকড়া ডাল-পাতা। স্পষ্ট বোঝা যায়, এগুলো পামগাছ।
পামগাছের ওই সারি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর রেলস্টেশনে। স্টেশন কাঁপিয়ে প্রতিদিন ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রামের রুটে ট্রেন চলাচল করে। ট্রেনের ধাবমান বাতাসে বারবার কেঁপে ওঠে গাছের পাতা। ট্রেনের জানালার ওপাশে কোনো যাত্রী হয়তো গাছগুলো দেখে মুগ্ধ হন, চলে যান একপশলা ভালো লাগা নিয়ে।
সম্প্রতি শমশেরনগর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বুনো চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পামগাছগুলো। মমতাহীন পড়ে আছে গাছগুলো; অনেকদিন এগুলোর পরিচর্যা হয়নি। পামগাছজুড়ে অনেক পরগাছা ও পরজীবী উদ্ভিদ ইচ্ছেমতো বেড়ে উঠেছে। এই পরজীবী উদ্ভিদের অনেকটাই ডালপালা মেলে রীতিমতো বুনো সংসার সাজিয়েছে। এর মধ্যে আছে বট-পাকুড়সহ ফার্নজাতীয় গাছ, আছে লতাগুল্ম, নানা ধরনের লতাপাতা। পরজীবী গাছ ডালপালা মেলে আঁকড়ে আছে পামগাছগুলো।
পামগাছ বর্ষজীবী উদ্ভিদ। গাছ রোপণের তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ফল আসা শুরু হয়। ৬০–৭০ বছর গাছে ফল ধরতে থাকে। একটি কাঁদির ওজন ৪০–৮০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এই গাছের ক্ষতি হয় না। তেল তৈরির জন্য রেলস্টেশনের এই পামগাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয় না। সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবেই এগুলো আছে।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে শমসেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্রয়াত চেয়ারম্যান আবদুল মছব্বির রেলওয়ের কাছ থেকে কৃষিজমি বন্দোবস্ত নিয়ে স্থানটিতে পামগাছ লাগিয়েছিলেন। প্রথম দিকে গাছ থেকে কিছু ফল আহরণ করা হয়েছিল। পরে হয়তো বীজ থেকে তেল আহরণের প্রক্রিয়াজাত করতে সমস্যা তৈরি হয়, সেই থেকে ফল আহরণ থেমে যায়। গাছের প্রতি যত্ন, পরিচর্যাও আর তেমন করা হয়নি। এরপর গাছগুলো নিজের মতো করে আছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ঝড়ঝঞ্ঝা সামলে স্টেশনের পৃথক সৌন্দর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দা গণমাধ্যমকর্মী মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মছব্বির রেলওয়ে থেকে জমি বন্দোবস্ত নিয়ে এখানে পামগাছ লাগিয়েছিলেন। পামফল সংগ্রহ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিই ছিল উদ্দেশ্য। তিনি কিছুদিন ফল সংগ্রহ করেছেন। পরে আর গাছগুলোর তেমন যত্ন নেওয়া হয়নি। অনেক মানুষ এই গাছ দেখতে আসেন। ছবি তোলেন। গাছগুলোর পরিচর্যা করলে গাছগুলো দেখতে আরও সুন্দর হতো। গাছের নিচে পাকা বেঞ্চ স্থাপন করা গেলে লোকজন এখানে বসে সময় কাটাতে পারতেন।
শমশেরনগর রেলস্টেশনের মাস্টার জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাছগুলোর কোনো যত্ন নেওয়া হয় না। যত্ন করলে সৌন্দর্য বাড়ত। কিন্তু আমাদের এ রকম সময়ও নেই; কিছু করার সুযোগও নেই।’