দস্যুদের কবল থেকে পালিয়ে তিন দিন সুন্দরবনে ঘুরে ঘুরে বাড়ি ফিরল কিশোর
‘মেহেদি, তুমি যদি আমাদের মাইকের আওয়াজ শুনে থাকো, ভয় পেয়ো না। খালের ধারে চলে আসো। আমরা তোমাকে নিতে এসেছি...।’
আজ রোববার (১৯ জুলাই) সকাল থেকে সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদীর বুকে বারবার ভেসে আসছিল এই ঘোষণা। তিনটি ট্রলার ও ছয়টি নৌকায় প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ নিখোঁজ কিশোর জেলে মেহেদি হাসানকে (১৬) খুঁজছিলেন। হ্যান্ডমাইক হাতে তাঁর মামা বারবার ডাকছিলেন—যদি বনের কোথাও লুকিয়ে থাকা মেহেদি সেই আওয়াজ শুনে চলে আসে।
এই তৎপরতার মধ্যেই দুপুরে খবর আসে, মেহেদি বাড়ি ফিরেছে। মুহূর্তেই স্বস্তি নেমে আসে খুলনার কয়রা উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে। দস্যুদের কবল থেকে পালিয়ে টানা তিন দিন তিন রাত সুন্দরবনের গহিন জঙ্গল পেরিয়ে একটি জেলে নৌকায় উঠে লোকালয়ে ফিরেছে সে।
কয়রার সুন্দরবনসংলগ্ন এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা বনকেন্দ্রিক। কেউ মাছ বা কাঁকড়া ধরেন, কেউ মধু কিংবা গোলপাতা সংগ্রহ করেন। বন্য প্রাণী ও জলজ সম্পদের প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। কিন্তু অভাবের তাড়নায় অনেক বনজীবী সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গোপনে বনে যান।
গত মঙ্গলবার এমনই কয়েকজন বনজীবীর সঙ্গে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিল মেহেদি। শাকবাড়িয়া নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের জোলাখালী খালে কাঁকড়া ধরার সময় তাঁদের নৌকা ঘিরে ফেলে আফজাল বাহিনীর দস্যুরা। জেলেদের ভাষ্য, বাহিনীর প্রধান আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে দস্যুরা মেহেদিকে নিজেদের নৌকায় তুলে নেয়। অন্য জেলেদের বলা হয়, বাড়ি ফিরে ২৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ পাঠাতে। টাকা পেলেই মেহেদিকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
পরিবারের সদস্যরা ধারদেনা করে দস্যুদের দাবি মতো ২৫ হাজার টাকাও পাঠান। কিন্তু টাকা পৌঁছানোর আগেই সুযোগ বুঝে দস্যুদের নৌকা থেকে পালিয়ে যায় মেহেদি। এদিকে মেহেদির খোঁজে স্বজনদের উৎকণ্ঠাও বাড়তে থাকে। টানা তিন দিন প্রতিদিনই তাঁরা নৌকা নিয়ে সুন্দরবনের নদী-খাল চষে বেড়ান। আজ সকালে সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান অভিযানে তিনটি ট্রলার ও ছয়টি নৌকায় প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ বনের দিকে যান। এর মধ্যে ফির আসে মেহেদি।
আজ বিকেলে মেহেদিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে মানুষের ভিড়। গ্রামের নারী-পুরুষ ফিরে আসা কিশোরটিকে একনজর দেখতে এসেছেন। ঘরের ভেতরে তখন গভীর ঘুমে মেহেদি। খালি গায়ে, পরনে শুধু লুঙ্গি। শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধরের কালশিটে দাগ, পা ফুলে আছে।
মেহেদির বাবা আবদুল্লাহ সরদার বলেন, ‘ডাকাতেরা ফোনে ২৫ হাজার টাকা চাইছিল। আমি টাকাও পাঠাইছিলাম। কিন্তু এরই মধ্যে ছেলে পালায়ে যায়। তিন দিন ডাকাতদের হাতে জিম্মি ছিল, তারপর আরও তিন দিন একা বনের মধ্যে ঘুরে বেড়াইছে। কিছুই খাতি পারেনি। অনেক মারধর করিছে ওরে। শরীরডা একেবারে ফুইলে গেছে। ছয় দিন পর ছেলেডারে ফিরি পাইছি।’
গ্রামবাসীর সঙ্গে মেহেদিকে খুঁজতে আজ সুন্দরবনে গিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুজ্জামান। বাড়ি ফেরার পর তিনি মেহেদির কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা শুনেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সে বলেছে, তিন দিন দস্যুদের কাছে জিম্মি ছিল। প্রতিদিনই মারধর করা হইছে। পরে নলবুনিয়া খালের ভেতর সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায়। প্রথম দিন শুধু দৌড়াইছে। একটু শব্দ হলেই মনে করেছে ডাকাতেরা পেছনে আসটিছে।’
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘দূর থেকে আমাগের নৌকাও দেখেছিল ও। কিন্তু নৌকায় অনেক মানুষ দেখে ভেবেছে, ডাকাতেরাই তারে খুঁজতিছে। তাই আরও গভীর জঙ্গলে চলে যায়। হরিণ যেমন বাঘের তাড়া খেয়ে দৌড়ায়, ঠিক তেমন দৌড়াইছে।’
কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান সরদার বলেন, আজ দুপুরে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের এক বাসিন্দা ফোন করে জানান, মেহেদি তাঁদের এলাকায় ফিরে এসেছে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন। বিষয়টি থানাকেও জানানো হয়েছে; কারণ, এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।
মেহেদির চাচা আবদুল বারী সরদার বলেন, ‘দস্যু দুলাভাই বাহিনীর প্রধান কয়েক দিন আগে কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়ার পর দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড আফজাল নিজের নামে বাহিনী পরিচালনা করতিছে। তার লোকজনই আমার ভাইপোরে ধইরে নিয়ে যায়। গত কয়েকটা দিন কী দুশ্চিন্তায় কাটিছে, বইলে বোঝানো যাবে না। আল্লাহর রহমতে ছেলেটা জীবিত ফিরিছে।’
বন বিভাগের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, ‘বর্তমানে সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারপরও তারা অবৈধভাবে বনে ঢুকেছিল। নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরেছিলাম। পরে শুনেছি ছেলেটি জীবিত ফিরে এসেছে।’