ওই সমাধিস্থলে রয়েছে ৭০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো ৫ শতাধিক সমাধি। পূর্ব পাশে বিশেষভাবে সংরক্ষিত প্রায় ৪০টি সমাধি। ধানজুড়ি কুষ্ঠ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যেসব রোগীর মৃত্যু হয়েছিল এবং যাঁদের মরদেহ পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়নি, তাঁদের এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছে। এখানে প্রতিবছর ২ নভেম্বর খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা মৃত ব্যক্তিদের আত্মার মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেন। তাঁদের ধর্মমতে, পুরো নভেম্বর মাসকে ‘মৃত ব্যক্তিদের মাস’ বলা হয়ে থাকে। নভেম্বর মাসের ২ তারিখে এ সমাধিস্থলে মৃত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে ‘মৃত ব্যক্তিদের পর্ব’ পালন করেন স্বজনেরা। নভেম্বরজুড়ে মৃত ব্যক্তিদের জন্য প্রার্থনা করবেন স্বজনেরা। আর এ পর্ব উপলক্ষেই এখানকার বাসিন্দারা তাঁদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃত স্বজনদের শান্তি ও কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করেন। সেই সঙ্গে জীবিত ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন।

বুধবার সকাল সাতটায় গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে খ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে এ অনুষ্ঠানের সূচনা করেন ধানজুড়ি খ্রিষ্টীয় মিশনের ফাদার ফাব্রিজিও কালেগারি। পরে সকাল সাড়ে আটটায় খ্রিষ্টযাগ শেষ হয়। বিকেল চারটায় দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান শুরু হলে সেখানে অংশ নিতে জড়ো হতে থাকেন গ্রামবাসী।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনেছেন, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে মৃত ব্যক্তিদের পর্ব পালন করা হয়ে থাকে। বংশপরম্পরায় এখনো এটি চলছে। পর্বের দিন সন্ধ্যায় খ্রিষ্টানভক্তরা মৃত স্বজনদের সমাধিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে এবং ফুল দিয়ে সমাধি সুসজ্জিত করেন। এ সময় সান্ধ্যর আকাশের রক্তিম আভা, প্রজ্বালিত মোমবাতির সোনালি আলো এবং সমাধির পাশে শোকার্ত স্বজন—সব মিলেমিশে অন্য রকম এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

ধানজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের পারগানা (প্রধান) ক্যারোবিন হেমব্রোম প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার চারটি গ্রামের খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর নভেম্বরের ২ তারিখে মৃত ব্যক্তিদের পর্ব পালন করেন। তাঁরা মৃত স্বজনদের স্মরণ করছেন, তাঁদের সমাধিতে মোমবাতি ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁদের আত্মার কল্যাণ কামনায় ঈশ্বরের কাছে অনুনয় করেন।

ধানজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফ্লাবিয়াস হেমব্রোম প্রথম আলোকে বলেন, এখানে আগে ১৪টি গ্রামের মানুষ তাঁদের মৃত স্বজনদের সমাধিস্থ করতেন। পরে স্থানসংকুলান না হওয়ায় সাতটি গ্রামের মানুষ তাঁদের স্বজনদের নিজ নিজ গ্রামে সমাধিস্থ করে থাকেন। ফ্লাবিয়াস হেমব্রোম বলেন, ‘এখানে আমার বাবা-মায়ের পূর্বপুরুষ ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সমাধি রয়েছে। ২ নভেম্বর তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় মিশনের গির্জা ও নিজ নিজ স্বজনের সমাধিস্থলে খ্রিষ্টযাগের প্রার্থনা করছি।’

ধানজুড়ি মিশনের পাল-পুরোহিত ফাদার মানুয়েল হেমব্রোম প্রথম আলোকে বলেন, খ্রিষ্টধর্মের শুধু ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাঁদের মৃত স্বজনদের আত্মার মঙ্গল কামনায় দিবসটি পালন করে থাকেন। ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ফাদার অধীয় নামের একজন সন্ন্যাসী ২ নভেম্বর প্রথম মৃত ব্যক্তিদের মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে এ পর্ব চালু করেন। পরে ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এটি সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। দিবসটি সামনে রেখে বুধবার ধানজুড়ির সমাধিস্থলে সমাধি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খ্রিষ্টযাগ, মোমবাতি প্রজ্বালন, মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা এবং এলাকার গরিব ও দুস্থ মানুষকে খাওয়ানো হয়েছে।