ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লার অনুপস্থিতিতে মাঠে ১৩ প্রার্থী, জমজমাট ভোটের লড়াই

মনির হোসেন কাসেমী, আব্দুল্লাহ্ আল আমিন, মোহাম্মদ শাহ্ আলম ও মোহাম্মদ আলী

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আসন হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ-৪ (সদর উপজেলার একাংশ)। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন ১৩ জন প্রার্থী। এরপরও আসনটির ব্যালটে ধানের শীষ কিংবা দাঁড়িপাল্লা প্রতীক থাকছে না। প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থীদের আসনটি ছেড়ে দিয়েছে।

এ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমী। এর আগেও তিনি এই আসনে জোটের প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁর দলের নির্বাচনী প্রতীক ‘খেজুরগাছ’। অন্যদিকে জামায়াতের সমর্থন পেয়ে মাঠে রয়েছেন নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আব্দুল্লাহ্ আল আমিন (শাপলা কলি)। তাঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন দলের প্রার্থী হয়ে মাঠে নেমেছেন বিএনপির সাবেক প্রভাবশালী তিন নেতা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল আসনটিতে প্রার্থী দিয়েছে। সব মিলিয়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে ভোটের লড়াই।

ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব প্রার্থীই জোরালো গণসংযোগ ও প্রচার চালাচ্ছেন। ভোটাররা বলছেন, উন্নয়ন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজমুক্ত পরিবেশ এবং যাঁকে সব সময় পাশে পাওয়া যাবে—এমন প্রার্থীকে তাঁরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে চান।

মাসদাইর এলাকার চা–দোকানি কামাল উদ্দিন বলেন, ভোটের হাওয়া বইছে। এখানে হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভিড়। শেষ পর্যন্ত ভোটে কে জিতবেন, তা নিয়েই দোকানে চায়ের আড্ডায় আলোচনা চলে।

মনির হোসেনের চিন্তা ‘দুই বিদ্রোহী’

জমিয়তে উলামায়ের প্রার্থী মনির হোসেন বিএনপি জোটের সমর্থন পেলেও ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীকের অনুপস্থিতি স্থানীয় বিএনপির ভোটার ও নেতা-কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মনির হোসেন কাসেমী নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে ধানের শীষের ভোটারদের জোটের প্রতীকের পক্ষে আনার চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।

এমন অবস্থায় ভোটের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছেন বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহ্ আলম এবং সাবেক সংসদ সদস্য জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। দুজনই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়ায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁদের দুজনকেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকা এবং তৃণমূল পর্যায়ে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে গিয়াস উদ্দিন ও মোহাম্মদ শাহ্ আলমের নিজস্ব অনুসারী রয়েছেন। বিএনপির সাধারণ কর্মীদের বড় একটি অংশ জোটের প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের প্রতি বেশি আবেগী ও অনুগত, যা জোটের প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

তবে মনির হোসেন কাসেমী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রচার চলছে নিয়মিত। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির নেতাকর্মীরাও আমার পক্ষে কাজ শুরু করেছেন। মূলধারার বাইরে গিয়ে কেউ কখনো সফল হতে পারেনি। আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’

হরিণ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ্ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনগণের প্রার্থী হিসেবে আমি যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি, গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার নিজের কোনো চাওয়া–পাওয়া নেই। একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবে জনগণ আমাকেই ভোট দেবে।’

অন্যদিকে ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন এলাকার মানুষের স্বার্থে কাজ করেছেন। নেতা–কর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁর জন্য কাজ করছেন। তবে কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

স্থানীয় বিএনপির নেতা–কর্মীদের মতে, খেজুরগাছ জোটের প্রতীক হলেও দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের ছেড়ে দেওয়া তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। আর দল যাঁকে প্রার্থী করেছে, তিনি নেতা–কর্মীদের সুখে–দুঃখে কতটা পাশে থাকতে পারবেন, সেটা নিয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

১১–দলীয় ঐক্যের একাধিক প্রার্থী

আসনটিতে জামায়াতে ইসলামী কোনো প্রার্থী না দিলেও ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে দুজন প্রার্থী আছেন। তাঁরা হলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ্ আল আমিন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হোসেন (রিকশা)।

এনসিপি নেতা আব্দুল্লাহ্ আল আমিন জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি সমমনা দলের সমর্থন পেয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমরা যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই ভালো সাড়া পাচ্ছি। ফলে এ আসনে ভোটের লড়াই এখন জোট ও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।’

আরও পড়ুন

রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীও আলোচনায়

নির্বাচনী মাঠে আরও একটি মাত্রা যোগ করেছেন বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির নির্বাহী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী। তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এবং একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতিও।

পরিচিত মুখ হওয়ায় বিএনপির ভোটারদের একটি অংশ তাঁর দিকে ঝুঁকতে পারে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটারদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। বিভিন্ন স্থানে আমার কর্মী-সমর্থকদের ধমকানো হচ্ছে। তবু আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’