স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন বরুড়ার শতবর্ষী তিন গম্বুজ মসজিদ
শত বছরের বেশি সময় ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ভাউকসার গ্রামের একটি মসজিদ। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনি, পুরু দেয়াল ও মোগল ধাঁচের নান্দনিক স্থাপত্য মসজিদটিকে করেছে অনন্য। এটি এলাকার ঐতিহ্য ও স্থাপত্য সৌন্দর্যেরও এক মূল্যবান নিদর্শন, যা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন দর্শনার্থীরা।
মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর স্বামী সৈয়দ মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী। তিনি সম্পদশালী জমিদার ছিলেন। নিজ বাড়ির সামনে ১৯০২ সালে এটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির নাম ‘ভাউকসার তিন গম্বুজ পুরাতন জামে মসজিদ’। এর ভেতরে প্রবেশের দরজার ওপরে লেখা, ‘বিরাতিছে স্বর্গধামে এই মসজিদ নির্মাণকারী অদ্বিতীয় দানশীল মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী। সন-১৩০৯ বাং, ১৯০২ ইং।’
কুমিল্লা নগর থেকে বরুড়ার ভাউকসার গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। বিজরা-ভাউকসার সড়ক দিয়ে গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে তিন গম্বুজবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন একটি মসজিদ। একটি দৃষ্টিনন্দন ফটক পেরিয়ে মূল মসজিদে ঢুকতে হয়। মসজিদে তিনটি গম্বুজ ছাড়াও তিনটি মিনার আছে। পাঁচটি কাঠের তৈরি দরজা। ভেতরে সুসজ্জিত দেয়াল ও দৃষ্টিনন্দন অলংকরণ। চুন-সুরকি দিয়ে বানানো মসজিদের ভেতরে ওপরের দিকে তাকাতেই বিভিন্ন ফুলের কারুকার্য যে কাউকেই মুগ্ধ করে।
২৫ বছর মসজিদটিতে ইমামতি করেছেন ভাউকসার গ্রামের মো. আবদুস সাত্তার। গত বছরের রোজায় ইমামতি জীবনের ইতি টানেন। তিনি বলেন, ‘এই মসজিদ আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী। এমন মসজিদে ২৫ বছর ইমামতি করেছি। এক বছর আগে অবসরে গেলেও এখনো বেশির ভাগ নামাজ এখানে আদায় করি।’
আবদুস সাত্তার বলেন, জমিদার সৈয়দ মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেন। যদিও পাশেই তাঁর বাবা এনায়েত গাজী চৌধুরীর নির্মিত আরেকটি মসজিদ আছে। সেটি এই মসজিদের আরও অর্ধশত বছরের বেশি সময় আগে নির্মাণ করা হয়। ওই মসজিদের পুরোনো অবকাঠামো এখন আর নেই। কয়েক দফা সংস্কারের পর নতুন করে করা হয়েছে। অবাক করা বিষয়, দুটি মসজিদই একটি পুকুরের দুই পাড়ে। পূর্ব পাশে এনায়েত গাজী চৌধুরীর মসজিদ আর পশ্চিম পাশে গাজী চৌধুরীর মসজিদ। এটি স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জমিদার পরিবারের কেউ এলাকায় থাকেন না।
মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই মানুষ ভিড় করেন উল্লেখ করে আবদুস সাত্তার বলেন, ‘এটি মোগল আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর মতোই স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, মসজিদের ডিজাইন কলকাতা থেকে পছন্দ করেছিলেন জমিদার মুহাম্মদ গাজী চৌধুরী। আর নির্মাণের জন্য শ্রমিক আনা হয়েছিল বিক্রমপুর থেকে।’
বর্তমান ইমাম হাফেজ মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে মসজিদের ভবন যেভাবে দেখেছি, এখনো সেভাবেই আছে। টুকটাক সংস্কার হলেও ১২৪ বছর পরও মসজিদটির কাঠামোতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিদিনই অনেকে মসজিদটি দেখতে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার অনেক দূরের মানুষও এখানে নামাজ পড়তে আসেন। আমরা চেষ্টা করি মসজিদের সৌন্দর্য যেন নষ্ট না হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব মো. আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, মসজিদের কারণে এলাকার অন্য রকম একটা পরিচিতি আছে। অনেক মানুষ পুরোনো মসজিদটি দেখতে আসেন। কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ ভিডিও করেন।
কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর প্রথম আলোকে বলেন, শত বছরের পুরোনো মসজিদটি ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আজও গৌরবের সঙ্গে টিকে আছে। মোগল আমলে নির্মিত মসজিদগুলোর সঙ্গে এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর বেশ মিল পাওয়া যায়।