আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ছেলে, বাইরে বাবার আকুতি ‘আল্লাহ, ছেলেটারে বাঁচাই দেও’

সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছেলেকে ছুয়ে দেখছেন বাবা আবদুল হাই। মঙ্গলবার দুপুরেছবি: প্রথম আলো

জন্মের দুই মাস পরই হৃদ্‌যন্ত্রে ছিদ্র ধরা পড়ে ৯ মাস বয়সী শিশু হাসান আহমেদের। সেই থেকে ধারদেনা করে ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছিলেন কৃষক বাবা আবদুল হাই। এর মধ্যে নতুন করে শিশুটির শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ১১ মে হাসপাতালে ভর্তির পর তিন দিন ধরে শিশুটি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।

সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে শিশুটির। হাসপাতালের শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (পিআইসিইউ) সামনের বেঞ্চে বসে ছিলেন আবদুল হাই। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ উঠে কাচঘেরা জানালায় গিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করলেন। দূর থেকে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। এরপর ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে ছেলের শয্যার পাশে গিয়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে আসেন।

মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে আবদুল হাই বলেন, ‘দুই মাস বয়সে যখন হার্টের ছিদ্র ধরা পড়ে, তখন থেকেই ধার করে বা স্বজনদের সহায়তায় চিকিৎসা চালাইতেছি। এর মধ্যে আবার হাম ধরা পড়ছে। কী করমু বুঝতেছি না।’ অস্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহ, আমার ছেলেটারে বাঁচাই দেও।’

আবদুল হাইয়ের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায়। কৃষিকাজ করে তাঁর সংসার চলে। চার সন্তানের মধ্যে হাসান সবার ছোট। ১১ মে থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসানকে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন আগে অবস্থার অবনতি হলে তাকে পিআইসিইউতে নেওয়া হয়।

আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেটির চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে তিনি এখন প্রায় নিঃস্ব। পরিবারে আরও তিন সন্তান আছে। কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চলে। কয়েক দিন আগে নিজের একটি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। এখন আবার ছেলে আইসিইউতে। টাকাপয়সা সব শেষ। বাড়িতে অন্য তিন বাচ্চাকে বোনের কাছে রেখে এসেছেন। তাদের জন্য এলাকার একটি দোকানে বলে এসেছেন।

হাসানের মা কহিনুর বেগম পিআইসিইউর ভেতরে ছেলের পাশে ছিলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে বাবা শুধু অপেক্ষা করছেন—কখন চিকিৎসকেরা ভালো কোনো খবর দেবেন। আবদুল হাই জানান, কয়েক দিন আগে হাসানের জ্বর ওঠে। শরীরে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিলে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই হাসপাতালে তাঁদের দিন-রাত কাটছে।

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু

সিলেটে গতকাল সোমবার সকাল আটটা থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সিলেট বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ৪০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আজ সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়।

মৃত শিশুরা হলো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের পলাশ কাহেরের ছয় মাস বয়সী মেয়ে ইশিতা কাহের, একই জেলার সামরাবাজার এলাকার সুজিত নমসুদ্রের ৯ মাস বয়সী মেয়ে সুস্মিতা ও সিলেট নগরের পীরমহল্লা এলাকার তৌহিদ আলীর ৯ মাস বয়সী মেয়ে লাবিবা। তাদের মধ্যে ইশিতা সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও বাকি দুজন সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সিলেট বিভাগে সন্দেহজনক ও হাম রোগে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। বাকিরা উপসর্গে মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কারও হাম শনাক্ত না হলেও উপসর্গ নিয়ে ৭৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট ১৪৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জে ১৬ জন, মৌলভীবাজারে ১৬ জন, সুনামগঞ্জে ৭৫ জন ও সিলেটের ৪২ জন।

মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২৮১ জন হামের উপসর্গের রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৭ জন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও ৭০ জন সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৪৮ জন চিকিৎসাধীন।