চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি জামে মসজিদের কমিটি ‘সমাজ সংস্কার’–এর নামে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো হারাম ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, এলাকায় কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গানবাজনা করলে সেখানে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়াতে যাবেন না স্থানীয় আলেমরা। প্রায় দুই মাস আগে এ বিষয়ে মসজিদ কমিটি এলাকায় একটি নোটিশ জারি করে। পরে বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।
মসজিদটি উপজেলার চরাঞ্চলের ইসলামপুর ইউনিয়নের তেররশিয়া পোড়াগ্রামে। ‘গানবাজনা বা বাদ্যযন্ত্রমুক্ত সমাজ গঠনের সিদ্ধান্ত’ শিরোনামে ওই গ্রামে একটি নোটিশ প্রচার করা হয়। এতে লেখা আছে, ‘এতদ্বারা পোড়াগ্রামবাসীর পক্ষ হতে জানানো যাচ্ছে যে, আমরা আমাদের গ্রামের পরিবেশ, যুবসমাজের নৈতিকতা এবং পারিবারিক শান্তি রক্ষার জন্য গ্রামের গণসম্মতির ভিত্তিতে শিরক, বিদ’আত, গান–বাজনা ও অপসংস্কৃতি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও ক্ষতিকর হওয়ায় গ্রামের সামাজিক কল্যাণের স্বার্থে আজ থেকে আমাদের গ্রামে প্রকাশ্যে উচ্চশব্দে বাদ্যযন্ত্র বা গান–বাজনা সম্পূর্ণরূপে হারাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। এর পরেও যারা বাদ্যযন্ত্র বাজাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নোটিশে মসজিদ কমিটির সদস্য ও গ্রামবাসীর পক্ষে ৩৪ জন স্বাক্ষর করেন। পাশাপাশি গ্রামের মোড়ে এ বিষয়ে কিছু ব্যানার ও ফেস্টুন টানানো হয়। নোটিশ জারির পর থেকে গ্রামে গানবাজনা বন্ধ আছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সম্প্রতি পুলিশ ওই গ্রামে গিয়ে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র হারাম বা নিষিদ্ধ লেখা ব্যানার, ফেস্টুন ও নোটিশ জব্দ করে থানায় নিয়ে আসে।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল (রাজন) প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনা জানার পর তাঁর দপ্তরে মসজিদ কমিটির সদস্যদের ডেকে পাঠান। মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এসে জানান, তাঁরা না বুঝে গ্রামে গানবাজনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা ভুল স্বীকার ও ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। এ ছাড়া মসজিদ কমিটি সভা করে লিখিতভাবে গানবাজনা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার পাশাপাশি ভুল স্বীকার করে ইউএনও অফিসে জমা দিয়ে যাওয়ার কথা হয়েছে।
মসজিদে গিয়ে ওই মসজিদের ইমাম আবদুল মালিক বিন খালেদুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। একবার তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি পরে কথা বলবেন, কিন্তু আর কথা বলেননি।
বৃহস্পতিবার ওই গ্রামে গিয়ে জানা যায়, প্রায় দুই মাস আগে তেররশিয়া পোড়াগ্রামের জামে মসজিদের ইমাম ও আলেমদের নেতৃত্বে গ্রামবাসীর এক সভা হয়। সেখানে ‘সমাজ সংস্কারের’ অজুহাতে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়, গ্রামে কোনো প্রকার গানবাজনা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো যাবে না। এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুধু সামাজিক অনুষ্ঠানই নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালাদের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এতে গ্রামে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গ্রামের প্রবীণদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও তরুণেরা এ সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট।
গ্রামের কয়েকজন নারী জানান, বিয়েবাড়িতে গীত গাওয়া যাবে না এবং সাউন্ডবক্স দিয়ে গান বাজানো যাবে না। যে বিয়েবাড়িতে গানবাজনা হবে, সে বাড়িতে ধর্মীয় মতে বিয়ে পড়াতে যাবেন না গ্রামের আলেমরা। গ্রামের কিশোররা মাঝেমধ্যে পিকনিক করে সাউন্ডবক্সে গান বাজায়, আমোদ–ফুর্তি করে, তা–ও বন্ধ আছে। এতে নারীরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের বয়স্ক এক লোক ও এক মাদ্রাসাছাত্র জানায়, মসজিদ কমিটির লোকজন এ–ও প্রচার করে যে, যারা নামাজ পড়বে না, তাদের জানাজা পড়ানো হবে না। কিন্তু এটা অনেকেই মানে না। তাঁরা বলেন, নামাজ পড়া না–পড়া ব্যক্তিগত পাপ–পুণ্যের বিষয়। এ জন্য জানাজা পড়ানো হবে না, এটা বলা ঠিক নয়। একজন দোকানদার বলেন, ‘আমার দোকানে টিভি আছে, কিন্তু আমি আর গান বাজাই না। খবর দেখি কেবল। ইসলামি জলসা বাজাই, ওয়াজ বাজাই।’
রবিউল ইসলাম নামের গ্রামের নেতৃস্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, বিয়ে মানে, আমোদ–ফুর্তির বিষয়। গানবাজনা বা গীত গাওয়া স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এটা তাঁরা বন্ধ করতে পারবেন না। আর গ্রামের মৌলভিরা না এলে বিয়ে পড়ানো বন্ধও থাকবে না। এ জন্য অনেক মৌলভিকে পাওয়া যাবে। মসজিদ কমিটির এ সিদ্ধান্ত অনেকেই মানবেন না।