ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারটি আসনে ‘বিদ্রোহীদের’ চাপে বিএনপি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির ছয়জন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। তাঁদের কারণে চাপে পড়েছেন দলটির মনোনীত প্রার্থীরা। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণে বিভক্তি দেখা দিয়েছে স্থানীয় বিএনপিতেও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী দুজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনেও দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী; একজন করে বিদ্রোহী প্রার্থী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন (নাসিরনগর)
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও গোকর্ণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ হান্নান। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন দলটির আমির এ কে এম আমিনুল ইসলাম। বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম কামরুজ্জামান (মামুন), উপজেলা বিএনপির সভাপতি থেকে আগেই বহিষ্কৃত বুড়িশ্বর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা ইকবাল চৌধুরী। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের আরও চারজন প্রার্থী রয়েছেন। তবে ভোটের মাঠে বেশি আলোচনায় বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নান, দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী কামরুজ্জামান, ইকবাল চৌধুরী ও জামায়াতের প্রার্থী আমিনুল ইসলামকে ঘিরে।
উপজেলা বিএনপির নেতা–কর্মীরা বলেন, ভোটের মাঠে আটজন প্রার্থী থাকলেও প্রচারণায় এগিয়ে বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুজ্জামান ও জামায়াতের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম। তাঁদের ঘিরেই ভোটারদের আগ্রহ বেশি। দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও কামরুজ্জামানের পক্ষে মাঠে কাজ করছেন স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ। এ জন্য গত শুক্রবার বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আবদুল হান্নান দলের ২২ নেতাকে বহিষ্কারের জন্য সুপারিশ করেছেন। বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে জামায়াত প্রার্থীর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্থানীয় ভোটাররা। এ ছাড়া উপজেলাটিতে প্রায় ৫০ হাজারের মতো হিন্দু ভোটার রয়েছেন। তাঁদের ভোটও নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে এখানে বিএনপির প্রার্থী এম হান্নান, বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুজ্জামান ও জামায়াতের প্রার্থী আমিনুল ইসলামের মধ্যই মূলত ত্রিমুখী লড়াই হবে।
উপজেলার ১০ জন ভোটারের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ছয়বার আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এবার ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকলেও বিএনপির নেতা এম এ হান্নানকে বেকায়দায় ফেলেছেন দলটির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান ও ইকবাল চৌধুরী। দুই বিদ্রোহী তাঁর ‘ঘাম ছোটাচ্ছেন’। আছেন জামায়াতের প্রার্থীও। এ ছাড়া এখানে হিন্দু ভোটার সব সময় বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের ভোট যাঁর বক্সে যাবে, তাঁরই জয়ের সম্ভাবনা থাকবে।
বিএনপির বিদ্রোহী ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান মামুন বলেন, ভোটারদের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাড়া মিলছে। সুষ্ঠু ভোট হলে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুজ্জামানের পক্ষে কাজ করায় ২২ নেতাকে বহিষ্কারের জন্য জেলা পর্যায়ে সুপারিশ করেছি। আর আমি মানুষের কাছ থেকে সাড়া পাচ্ছি। জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’
ভোট নিয়ে কথা বলতে জামায়াতের প্রার্থী আমিনুল ইসলামের মুঠোফোনে কল করা হলে তাঁর সহকারী পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, ‘স্যার অসুস্থ। চিকিৎসক কথা বলার জন্য নিষেধ করেছেন।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা)
আসনটি বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে। এখানে দলটির প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবীব। তবে স্বস্তিতে নেই তিনি। আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন রুমিন ফারহানা (হাঁস মার্কা)। দলের নির্দেশনা অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে। তাঁকেও বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
স্থানীয় অন্তত আটজন সাধারণ ভোটার জানান, এই আসনে দল–মতনির্বিশেষে মানুষ হাঁস প্রতীকের প্রার্থী রুমিন ফারহানার পক্ষে। এখানে রুমিন ফারহানার পক্ষে জোয়ার উঠেছে। তার জোয়ার কোনোভাবেই থামানো যাবে না। কারণ, তিনি কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলেন না। তিনি বিজয়ী হলে এই আসনে এবার উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে বলে ভোটারদের বিশ্বাস। ভোটারদের আস্থায় পরিণত হয়েছেন রুমিন ফারহানা। তাঁর পক্ষে থাকায় বিএনপির অনেক নেতা–কর্মী ইতিমধ্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে তাঁরা রুমিন ফারহানার পিছু ছাড়েননি।
ভোটের লড়াই নিয়ে কথা বলতে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী জোনায়েদ আল হাবিবের।
তবে জয়ের বিষয়ে আশাবাদী রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। তবে আমার মাঠ নষ্ট করার জন্য মাঠে প্রতিপক্ষের লোকজনের কালোটাকার ছড়াছড়ি হচ্ছে। আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দেওয়াসহ ভয় দেখানো হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে আমি জানিয়েছি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসন (নবীনগর)
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আবদুল মান্নান (ধানের শীষ)। দলটি থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির অর্থনৈতিকবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কৃত কাজী নাজমুল হোসেন (ফুটবল)। আর ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষে প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমজাদ হোসাইন (রিকশা)। অন্য যাঁরা প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নজরুল ইসলাম (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম (লাঙ্গল), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম (আপেল), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. শাহীন (কাস্তে) ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী নাহিদা জাহান (মাথাল)।
প্রার্থীদের মধ্যে কাজী নাজমুল হোসেন তাপস ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর বাবা প্রয়াত কাজী আনোয়ার হোসেন এই আসনের চারবারের সংসদ সদস্য ছিলেন।
বিএনপির দলীয় নেতা–কর্মী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা বিএনপির সদস্য হযরত আলী ও আবু সাঈদ, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম, সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক মেয়র মাইনু উদ্দিনসহ একাধিক নেতা–কর্মী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে মাঠে সরব। এ জন্য দল থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম ও দলের বড় একটি অংশের নেতা-কর্মীর কাজী নাজমুল হোসেনের পক্ষে রয়েছেন। পাশাপাশি বাবার জনপ্রিয়তা, প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় থাকা এবং তৃণমূলে জনপ্রিয়তার কারণে তিনি এগিয়ে রয়েছেন।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কাজী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘যে-ই বিজয়ী হোক, আমার চাওয়া মানুষ যেন শান্তিতে ভোট দিতে পারে। প্রশাসনিক হয়রানি যেন না হয়। বিএনপির প্রার্থী ও তাঁর লোকজন আমার নেতা-কর্মীদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিএনপির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ আমার পক্ষে রয়েছে। আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’
আসনটিতে বিএনপির ভোট দৃশ্যত দুই ভাগ হবে। এ বিষয়ে দলটির প্রার্থী আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা বিএনপির কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাচ্ছি না। উপজেলা বিএনপিসহ তৃণমূল বিএনপির নেতা–কর্মীরা পাশে আছেন। তবে কিছু নেতা–কর্মী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন। তবে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর)
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এ আসনেও (বাঞ্ছারামপুর) যুগপৎ আন্দোলনের শরিককে ছাড় দিয়েছে বিএনপি। এ আসনে দলটির সমর্থিত প্রার্থী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। এখানে জামায়াতের প্রার্থী মো. মোহসিন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি ও বিএনপি নেতা মো. সাইদুজ্জামান কামাল। এ ছাড়া আরও সাতজন প্রার্থী রয়েছেন আসনটিতে।
ভোটারদের ভাষ্যমতে, এগিয়ে আছেন জোনায়েদ সাকি। কেননা, স্থানীয় বিএনপি থেকে তিনি সমর্থন ও সহযোগিতা পাচ্ছেন। এর পরও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বিএনপি শিবিরের ভোট কিছুটা হলেও ভাগাভাগি হবে। তাই হলে বিষয়টি সুযোগ বইয়ে আনতে পারে জামায়াতের প্রার্থীর জন্য। সে ক্ষেত্রে বিএনপি–সমর্থিত জোনায়েদ সাকির সঙ্গে মূল লড়াই হবে জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে।
জেলা জামায়াতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে আমাদের প্রার্থী ভালো অবস্থানে থাকবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে ভোটারদের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিলছে। এই আসনে আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’
একাধিকবার চেষ্টা করেও মুঠোফোন না ধরায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুজ্জামান কামাল এবং জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী মো. মহসীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি সমর্থতি প্রার্থী জোনায়েদ সাকি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা তৎপরতার কথা শোনা যাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ যেন একটি স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দেন। আমরা সবাই প্রতিযোগী। সবার মাঝে গণতান্ত্রিক মানসিকতা থাকা দরকার। নানা কলা কৌশল ও প্রভাব বিস্তার থেকে সব ভোটারা যেন এসব কিছু থেকে বিরত থাকেন, এটা আমার বিনীত অনুরোধ।’
এক প্রশ্নের জবাবে জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাথাল মার্কার পক্ষে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁরা অনেক বেশি তৎপর রয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’