মৌলভীবাজার শহরের পাশে বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, সবুজে ঘেরা এক নির্জন বন
দুপাশে কোথাও ঘন, কোথাও হালকা গাছগাছালি। বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে পাকা সড়ক। দিনদুপুরেও গাছের নিবিড় ছায়া সড়কের ওপর। ছায়া মাড়িয়ে ছুটে চলছে ছোট-বড় নানা যানবাহন। সড়কটির পাশেই ‘বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক’। শহরের কাছেই ছোট ছোট টিলায় ঘেরা চিরহরিৎ এই বনাঞ্চল। চারপাশে গ্রাম, ঘরবাড়ি ও নাগরিক কোলাহলের মধ্যেও বনটি যেন ধরে রেখেছে নিজের নির্জনতা।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় শহর থেকে প্রায় দুই–আড়াই কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে এই বন। ১৯১৬ সালে এটিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। পরে ২০০৬ সালে ৮৮৭ একর আয়তনের এই প্রাকৃতিক বনকে ইকোপার্ক ঘোষণা করে সরকার। বনজুড়ে কোথাও ঘন ছায়া, কোথাও রোদের ঝিলিক। আছে বনের পাখির ডাক, বন্য প্রাণীর বিচরণ আর বুকে ভয় ধরানো নির্জনতা।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের পাশ দিয়ে কালেঙ্গার দিকে যেতে যেতে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। সড়কের ওপর গাছের ছায়া ঘন হতে থাকে। কোথাও রোদের দেখা নেই, আবার কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে সড়কের ওপর গোল চাকতির মতো রোদ এসে পড়ে। একটি মোড়ে গিয়েই চোখে পড়ে বর্ষিজোড়া ইকোপার্কের তোরণ। দুই পাশে দুটি হরিণ, ওপরে বানর ও ইগল। তবে এগুলো কংক্রিটের তৈরি। সময়ের ছাপ পড়েছে তোরণেও। গায়ে জমেছে শেওলা। ‘বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, মৌলভীবাজার’ লেখাটিও অনেকটা ঢেকে গেছে শেওলায়।
তোরণ পেরিয়ে ইকোপার্কের ভেতরে ঢুকতে হয়। বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে ইটবিছানো সরু পথ। দুই পাশে শাল, গর্জন, শিমুল, বনাক, সেগুন, জারুল, চিকরাশি, বহেড়া, আমলকী, লোহাকাঠসহ নানা ধরনের গাছ চোখে পড়ে। কোথাও রোদ এসে পড়েছে গাছের গায়ে, পাতার ওপর ঝলমল করছে আলো। আবার কয়েক কদম এগোলেই ঘন ছায়া। রোদ–ছায়ার লুকোচুরি খেলা।
বনের ভেতরে যেতেই ছায়া আরও ঘন হয়ে ওঠে। চারপাশে গভীর সবুজ। সরু পথ ধরে গ্রামের দু-একজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন। কেউ হয়তো শহরের দিকে, কেউ ফিরছেন বাড়ির পথে। দুপুরের নিস্তব্ধতায় মানুষের চলাচলও খুব বেশি নয়। প্রাণীদেরও দেখা মেলে না। মাঝেমধ্যে বাতাস আসে। গাছের পাতাগুলো নড়ে ওঠে। আবার সবকিছু শান্ত হয়ে যায়। ছোট ছোট টিলাগুলোও সবুজে ঢাকা।
এই বনে বানর, হনুমান, শিয়াল, মেছো বাঘ, উদ্বিড়াল, কাঠবিড়ালি, সজারু, বেজি, বনরুই, গুইসাপ, খরগোশসহ নানা বন্য প্রাণী থাকার কথা জানা যায়। তবে বর্তমানে এসব প্রাণীর কতগুলো এই বনে টিকে আছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বনে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ রয়েছে। এ ছাড়া ঘুঘু, শালিক, টিয়া, বাবুই, বক, দোয়েল, ফিঙে, মাছরাঙা, চিল, কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন পাখি আছে। দুপুরের নির্জনতায় কয়েকটি পাখির ডাকও শোনা গেল।
তবে সময়ের সঙ্গে এই বনের প্রাণবৈচিত্র্যও বদলেছে। একসময় এখানে চিতাবাঘ, মায়াহরিণ ও উল্লুকের মতো প্রাণী ছিল বলে জানা যায়। এখন সেসব প্রাণী আর দেখা যায় না। বন ঘিরে বেড়েছে বসতি, পাকা ঘরবাড়ি ও মানুষের চলাচল। বনের ভেতরে ছোট কয়েকটি ছড়াও আছে। দুপুরে সেগুলোর কয়েকটিতে পানি দেখা গেল না। বৃষ্টির সময় হয়তো সেখানে পানির প্রবাহ তৈরি হয়।
ফেরার পথে ছোট ছোট গাছের ফাঁকে হঠাৎ চোখে পড়ে গোলাপি রঙের বন আদার ফুল। সবুজের মধ্যে ছোট্ট কয়েকটি ফুল। খুব সাধারণ, অথচ চোখ আটকে যায়। মনে হয়, বন এখনো নিজের মতো করে বেঁচে আছে। মানুষের বসতি ও কোলাহলের কাছাকাছি থেকেও গাছপালা, পাখি আর বুনো ফুলেরা টিকে আছে। এখনো তারা মানুষের অকৃত্রিম প্রতিবেশী।