শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক দুজন, এজলাস একটি, পিপি আসেন অন্য আদালত থেকে

শিশু নিপীড়নপ্রতীকী ছবি

বিচারক দুজন; কিন্তু এজলাস একটি। একজন নামলে আরেকজনকে এজলাসে উঠতে হয় বিচারকাজ পরিচালনার জন্য। রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য নেই কোনো সরকারি কৌঁসুলি (পিপি)। অন্য আদালতের কৌঁসুলিকে অতিরিক্ত হিসেবে এখানে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এটি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের চিত্র।

শিশু ধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৯২টি মামলা বিচারাধীন। গত সাড়ে চার মাসে এই ট্রাইব্যুনালে মাত্র একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

সরকারি কৌঁসুলিরা বলছেন, জোড়াতালি দিয়ে চলছে এই ট্রাইব্যুনাল। শিশুধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক এজলাস, পিপি নিয়োগ, কর্মকর্তা–কর্মচারীর সংকট দূর করতে হবে। পাশাপাশি সাক্ষীদের দ্রুত হাজির করে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে।

আরও পড়ুন

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ২০০০ (সংশোধিত ২০২৬) আইনে শিশুধর্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতার বিচারকাজ পরিচালনায় বিশেষায়িত ‘শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের বিধান করা হয়।

চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের চতুর্থ তলায় নগরের ১৬ থানা ও জেলার ১৭ থানার জন্য পৃথক দুটি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করেন গত ১২ জানুয়ারি থেকে। এর আগে শিশুধর্ষণের মামলাগুলোর বিচারকাজ হতো চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন–সংক্রান্ত সাতটি ট্রাইব্যুনালে।

নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। শিশুটির বাবা প্রথম আলোকে বলেন, আলাদা ট্রাইব্যুনাল হওয়ার পর তিনি আশা করেছিলেন, দ্রুত বিচার পাবেন; কিন্তু এখনো সাক্ষ্যই হয়নি। ঘটনাটি ২০২২ সালের।

একইভাবে চান্দগাঁও এলাকার ২০১৯ সালের শিশুধর্ষণের মামলার বিচারও শেষ হয়নি। এ ঘটনায় মাহবুবুল আলম নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলাটির বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

এদিকে নগরের বাকলিয়ায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের মামলার ২৬ দিনের মাথায় রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গত বুধবার এ মামলায় আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত ২২ মে শিশুটির বাবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি করেন।

শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের সরকারি কৌঁসুলি মাহমুদুল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিচার শুরু হওয়ার আট কার্যদিবসের মধ্যে শিশুধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করলেন আদালত।

এর আগে ৯ জুন মামলার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ৫ কার্যদিবসে তদন্ত শেষে ৪ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় বাকলিয়া থানার পুলিশ।

মামলা দ্রুত শেষ করতে করণীয়

শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন নগরের ১৬ থানার ৬৭৭টি মামলা। এই ট্রাইব্যুনালে ভারপ্রাপ্ত সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে কর্মরত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২–এর কৌঁসুলি মাহমুদুল আলম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মহানগর ট্রাইব্যুনালের পাশাপাশি জেলা ট্রাইব্যুনালের বিচারকও এক এজলাসে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দুটি আলাদা এজলাস থাকলে বিচারকাজ আরও দ্রুত হতো। তিনি বলেন, ‘নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালের পাশাপাশি আমাদের এখানে অতিরিক্ত সময় দিতে হচ্ছে। এখানে আলাদা সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ দেওয়া হলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাবে।’

একই মন্তব্য করেন শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম জেলার ভারপ্রাপ্ত সরকারি কৌঁসুলি আলমগীর মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১–এরও কৌঁসুলি। আলমগীর মোহাম্মদ ইউনুস প্রথম আলোকে বলেন, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বাদী, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ধার্য দিনে হাজির করা উচিত। অনুপস্থিতির কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বেঞ্চ সহকারী, জারিকারকসহ প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া দরকার। তাহলেই ধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

ধর্ষণের ঘটনা রোধে এসব মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামে চালু হওয়া শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে প্রয়োজনীয় এজলাস, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সরকারি কৌঁসুলি নেই। এই সংকট দূর করতে হবে।