রংপুরে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যা মামলায় একজন গ্রেপ্তার
রংপুরের তারাগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়কে নিজ বাড়িতে হত্যার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার ভোরে উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের শেরমস্ত বালাপাড়া এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মোরছালিন (২২)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু সাইয়ুম তালুকদার জানান, হত্যার দুই দিন আগে মোরছালিন যোগেশ চন্দ্রের বাড়িতে টাইলস লাগানোর কাজ করেন।
এর আগে গত শনিবার রাতে তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে খুন হন মুক্তিযোদ্ধা এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যোগেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়। পরদিন রোববার সকালে প্রতিবেশীরা ডাকাডাকি করেও তাঁদের সাড়া পাননি। একপর্যায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে ওই দম্পতির রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান।
এ ঘটনায় ওই দম্পতির বড় ছেলে শোভেন চন্দ্র রায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে তারাগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। সেই মামলায় মোরছালিনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে মোরছালিনকে যোগেশ চন্দ্রের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই বাড়ি থেকে একটি দা ও পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কুড়ালের হাতল উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের আগে মোরছালিন ওই বাড়িতে টাইলস মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে তিন দিন কাজ করেছেন। বাড়িতে ওই দম্পতির একা থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন। মোরছালিনের আট হাজার টাকা দেনা ছিল। যোগেশের বাড়িতে কাজ করার সময় তাঁর মনে হয়েছিল, এ বাড়িতে টাকাপয়সা আছে। দেনা পরিশোধের জন্য তিনি চাপে পড়লে উপায় না পেয়ে তাঁর বাড়িতে থাকা কুড়াল নিয়ে রহিমাপুর গ্রামে যান এবং যোগেশ ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেন। এরপর তাঁদের বাড়িতে থাকা একটি দা দিয়ে আলমারি ভাঙেন। কিন্তু সেখানে টাকা না পেয়ে বাড়িতে থাকা আমগাছ বেয়ে বাথরুমের ছাদে উঠে পেছনের কাঁঠালগাছ বেয়ে নামেন। পাশে থাকা পুকুরে হত্যায় ব্যবহৃত কুড়াল ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান। যোগেশ চন্দ্রের সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল না।
শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, অস্ত্র উদ্ধারের খবরে এলাকায় উৎসুক মানুষের ভিড়। মোরছালিন পুলিশকে দেখাচ্ছিলেন—কীভাবে তিনি হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যান। পুকুরের পানি শ্যালো মেশিন দিয়ে কমিয়ে কুড়ালের লোহার অংশ খোঁজার চেষ্টা চলছে।
যোগেশ চন্দ্রের বড় ছেলে শোভেন চন্দ্র রায় বলেন, ‘মোরছালিন বাড়িতে কাজ করার সময় আমার মায়ের প্রায় পাঁচ হাজার টাকা দামের শাড়ি ও মাটির একটি ব্যাংক চুরি করেছিল। পরে দুই হাজার টাকা নিয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে এসে প্রতিবেশীদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। বিষয়টি বাবা-মা বলেনি। আমার মা–বাবার খুনিকে ধরা হয়েছে। হত্যাকারীর ফাঁসি যেন কার্যকর হয়, এটাই আমার চাওয়া।’
রংপুরের পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন বলেন, গ্রেপ্তারের পর মোরছালিন হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বাড়ি থেকে কুড়াল এনে একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। প্রথমে সুবর্ণা রায়কে, পরে যোগেশ চন্দ্রকে হত্যা করেন। পুকুর থেকে কুড়ালের হাতল উদ্ধার করা হয়েছে। লোহার অংশও উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। শ্যালো মেশিন দিয়ে পুকুরের পানি সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।
এদিকে বেলা তিনটার দিকে আলমপুর ইউনিয়নের শেরমস্ত বালাপাড়া গ্রামে মোরছালিনের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা-মাকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বোন রিমি আক্তার জানান, মোরছালিন তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁরা চার ভাই–বোন। তাঁর বড় ভাই রাজশাহীতে চাকরি করেন। এক বোনের বিয়ে হয়েছে। মোরছালিনের বড় ভাই রাজশাহী থেকে বাড়িতে আট হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মোরছালিন সেই টাকা বাড়িতে দেননি। এটা নিয়ে ঝামেলা চলছিল।