পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা কাদা, গাছপালা আর মাটি চাপা দিয়েছে টিনের ছাউনির একটি ঘর। দেবে গেছে চালা। ভেঙে পড়েছে দেয়ালের একটি অংশ। কয়েক ঘণ্টা আগেও যেখানে ছিল একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন, সেখানে এখন শুধু মানুষের ভিড় আর আহাজারি।
চট্টগ্রাম নগরের মেয়র গলির মুক্তিযোদ্ধা পাহাড়ের পাদদেশে ছিল সামিয়া ইসলামদের বসতি। আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে তাদের ঘরের ওপর। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা যায় ১৩ বছরের সামিয়া ইসলাম।
সরেজমিন দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে সারি করে থাকা টিন ছাউনি ঘরগুলোর একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদামাটি ঘরের এক পাশ পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে। ঘরের পেছনটা ডুবে আছে হাঁটুসমান কাদায়। সেই কাদা মাড়িয়েই স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে যাতায়াত করছেন। কয়েক গজ দূরেই বহুতল একটি ভবন। আর তার ঠিক পাশেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে ছিল সামিয়াদের ঘরটি।
সামিয়ারা তিন বোন। সে ছিল সবার ছোট। তার মা শিরিন বেগম পেশায় গৃহকর্মী। বাবা মোহাম্মদ ফারুক মাছের বিক্রেতা।
আজ দুপুর ১২টার দিকে সেখানে গেলে দেখা যায়, ঘর থেকে কয়েক গজ দূরে বসে কাঁদছিলেন সামিয়ার বড় বোন রিয়া আক্তার। তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতিবেশীরা। কেউ কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু কোনো কথাতেই কান্না থামছিল না। হঠাৎ বুক চাপড়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘আমার বোনটারে এনে দেন। আমার ছোট বোনটা সকালেই আমার সঙ্গে বসে ভাত খাইল। আমার বোনটারে আমার বুকে ফিরায় দেন।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি হচ্ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যায়। তখন ঘরে একাই ছিল সামিয়া। হঠাৎ পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে টিনের ঘরের ওপর। মুহূর্তেই মাটি, গাছপালা আর ভাঙা দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে যায় সে।
প্রতিবেশীর চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। কেউ খালি হাতে কাদা সরিয়েছেন, কেউ ভাঙা দেয়ালের ইট সরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই সামিয়ার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাকে বের করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়েছে।
সড়কের পাশে বসে তখনো কাঁদছিলেন সামিয়ার খালা শ্যামলী বেগম। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বললেন, ‘মেয়েটা সবার আদরের ছিল। স্কুলে পড়ত। ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল! একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, বড় হলে কাজে লাগবে। কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।’
খালার কথা শেষ হওয়ার আগেই রিয়া বলে ওঠেন, ‘আমি কতবার বলছি, এই বাসা ছেড়ে দিতে। পাহাড়ের পাশে থাকিস না। কেউ আমার কথা শুনল না। এখন পাহাড় আমার বোনটারে নিয়ে গেল।’
দুর্ঘটনার সময় সামিয়ার মা–বাবা দুজনের কেউই বাসায় ছিলেন না। খবর পেয়ে ছুটে এসে দেখেন, মেয়েকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
প্রতিবেশী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘বৃষ্টি এত বেশি ছিল যে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তারপরও আমরা কয়েকজন মিলে মাটি সরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেয়াল আর কাদার নিচ থেকে ওকে বের করতে পারিনি।’
চট্টগ্রামে কয়েক দিন ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর আজ বেলা ৩টা পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে ১০৬ মিলিমিটার বৃষ্টি। এটি অতি ভারী বর্ষণের মধ্যে পড়ে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মো. জহিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। আগামী অন্তত দুই দিন একই ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।
টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। নগরের পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে বসবাসকারীদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন পাহাড়ে পাহাড়ে মাইকিং করছে। পাহাড়ের বসতিদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, তবে কাজের কাজ হচ্ছে না। এখনো পাহাড়গুলোতে রয়ে গেছে অবৈধ বসতি।
এর আগে গতকালও টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরে আরেকটি প্রাণ ঝরে যায়। পাঁচলাইশ থানার রহমাননগর এলাকায় পাহাড়ের ওপর দেয়ালচাপায় মারা যান ৩২ বছর বয়সী সফিকুল ইসলাম। ওই ঘটনায় তাঁর দেড় বছর বয়সী মেয়ে সাইফা ও শাশুড়ি মর্জিনা বেগম আহত হন।