ফারাজ হোসেনের জন্মদিনে বিনা মূল্যে চিকিৎসা পেলেন দরিদ্র মানুষেরা
ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকায় বিনা মূল্যে চিকিৎসাশিবির অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল ও কক্সবাজারে এসব চিকিৎসাশিবিরে দিনব্যাপী দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় ‘ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশনের’ পক্ষ থেকে এসব চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করা হয়। সেখানে রোগীদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বিনা মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হয়।
২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত হন ফারাজ আইয়াজ হোসেন। দুই বন্ধুকে ছেড়ে আসতে অস্বীকৃতি জানানোয় জঙ্গিদের হাতে তিনি নৃশংসভাবে খুন হন। তিনি ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি। সাহসী এই তরুণের নামেই ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন গড়েছে তাঁর পরিবার। ফাউন্ডেশন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্যসহায়তা প্রদান, হতদরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ প্রদানসহ সারা দেশে নানা মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করা হয় সদর উপজেলার গৌতমপাড়া ঘাটুরা উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে দিনব্যাপী চার শতাধিক মানুষ চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়েছেন।
চিকিৎসা নিতে আসাদের একজন ঘাটুরা এলাকার বাসিন্দা মরিয়ম বেগম (৬৫)। তিনি দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্ট ও বুকের ব্যথায় ভুগছিলেন। তিনি জানান, বাজার থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে তিনি সাময়িক উপকার পান। কিন্তু পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে কোথাও গিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে পারেননি। তাই চিকিৎসা শিবিরের কথা শুনে তিনি এখানে চলে এসেছেন। সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ ও বিনা মূল্যে ওষুধ পেয়ে খুশি হয়ে মরিয়ম বেগম বলেন, ‘আমরার গরিবের লইগ্গা এমন আয়োজন য্যারা করছে, হেরারে আল্লায় বাঁচাইয়া রাখুক। আমি অন্তর থেইক্যা দোয়া করুম।’
চিকিৎসাসেবা পেয়ে নিজেদের খুশির কথা জানালেন দীর্ঘদিন ধরে জ্বালাপোড়া, উচ্চ রক্তচাপ ও ঘুমের সমস্যায় ভোগা ঘাটুরার সরকার পাড়ার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন (৭০), বুকে-পিঠে ব্যথায় ভোগা ঘাটুরার সাগর হোসাইন (৩৬), উচ্চ রক্তচাপে ভোগা একই এলাকার মোকাব্বির হোসাইন ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভোগা গৌতমপাড়ার সাবিনা আক্তার।
গৌতমপাড়ায় চিকিৎসাসেবা দেন শিশুরোগবিশেষজ্ঞ হোসাইন মাহবুব শিশির, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মেহেদী হাসান ও গাইনিবিশেষজ্ঞ রিয়া মনি দাস। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এসকেএফের আঞ্চলিক বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. রুহুল আমিন, জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. মহসিন খন্দকার, শামীম আহমেদ প্রমুখ।
কুমিল্লা
কুমিল্লায় আয়োজিত চিকিৎসাশিবিরে সেবা পেয়ে তিন শতাধিক মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। বুধবার দুপুরের পর থেকে নগরের উত্তর শুভপুর এলাকায় এই ক্যাম্প শুরু হয়; চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
বিকেলে সরেজমিন দেখা গেছে, ক্যাম্পে সেবাপ্রত্যাশী মানুষের ভিড়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একের পর এক রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। যত্নসহকারে চিকিৎসাসেবা ও ফেরার পথে বিনা মূল্যে ওষুধ পেয়ে খুশি অসহায় রোগীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা পান্না আক্তার এই ক্যাম্পে এসে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পেয়ে ভীষণ খুশি। তিনি বলেন, শরীরে বিভিন্ন সমস্যা, টাকার অভাবে বড় ডাক্তার দেখা পারেননি দীর্ঘদিন। আজকে এখানে এসে বিনা পয়সায় বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন। ডাক্তার ভালো করে দেখেছেন, ফেরার সময় টাকা ছাড়া ওষুধও দিয়েছেন। এমন উদ্যোগে এলাকার গরিব মানুষগুলোর অনেক উপকার হলো।
ষাটোর্ধ্ব আবুল হাশেমও বিনা খরচে চিকিৎসা ও ওষুধ পেয়ে খুশি। তিনি বলেন, ‘বহুদিন ধইরা টাকার লাইগ্যা ডাক্তার দেখাইতাম পারছি না। আজকা টাকা ছাড়াই ডাক্তার দেখাইছি, ওষুধও পাইছি। আমি তাঁরার লাইগ্যা দোয়া করি। আল্লায় তাঁরার ভালা করুক।’
এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের কুমিল্লা অঞ্চলের সহকারী বিপণন ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুর রহমান মজুমদার বলেন, নগরের এই এলাকাটিতে নিম্ন আয় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা বেশি। চিকিৎসা নিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ এসেছিলেন। সামনে আরও বড় পরিসরে চিকিৎসাশিবির আয়োজনের চেষ্টা করা হবে।
টাঙ্গাইল
টাঙ্গাইলে চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করা হয় ঘাটাইল উপজেলার ঝড়কা গ্রামে। দিনব্যাপী আয়োজিত মেডিক্যাল ক্যাম্পে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়। সেখানে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি অ্যান্ড অবস, নাক কান গলা, দন্ত, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি ও শিশুরোগবিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সেবা দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার শেখ মো. রবিউল ইসলামসহ অন্য কর্মকর্তারা। সারা দিন প্রায় ৩৫০ জন রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদান করা হয়।
কক্সবাজার
‘মানবতার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা’ শিরোনামে কক্সবাজারের রামুর আমতলিয়াপাড়ায় সকাল নয়টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করা হয়। এতে ২৩১ জন রোগী চিকিৎসা ও ওষুধ নেন।
আমতলিয়াপাড়ার একটি ভবনের নিচতলায় চিকিৎসাশিবির পরিচালনা করেন চিকিৎসক রাদ শারার রহমান, ইয়াছিন মো. আবদুল্লাহ ও তাশনোভা শাওরীন রহমান।
শুরুতে রোগীদের উদ্দেশে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প আয়োজনের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন এসকেএফ কক্সবাজারের আঞ্চলিক বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. আরিফুর রহমান খান।
চিকিৎসকেরা জানান, তাঁরা গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি, নাক-কান-গলা, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, শিশুরোগের চিকিৎসা দিয়েছেন। সহযোগিতা করেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের জ্যেষ্ঠ মাঠ ব্যবস্থাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র মেডিক্যাল সার্ভিসেস অফিসার রাসেল আহমদ, মেডিক্যাল সার্ভিসেস অফিসার হাফিজুল ইসলাম প্রমুখ।
ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন আয়োজিত চিকিৎসাশিবিরে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্থানীয় আমতলিয়াপাড়ার বাসিন্দা হোছন আহমদ (৭৩)। তিনি বলেন, ‘কোমরসহ সারা শরীর ব্যথা, রাতে ঘুমাতে পারি না। এখানে টাকা ছাড়াই চিকিৎসা করাতে পেরেছি, ওষুধও পেয়েছি। এবার শান্তিতে ঘুমাতে পারব।’
রামুর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের চা-বাগান এলাকা থেকে জ্বরে আক্রান্ত এক বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন পেশায় কাঠমিস্ত্রি দিদারুল আলম। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখেছেন। ওষুধও পেয়েছি। বিনা মূল্যে এমন সেবা পাব ভাবিনি।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও প্রতিনিধি, কুমিল্লা]